ভাবনা সমসাময়িক

ভাবনা সমসাময়িক । 
~~~~~~~~~~~ 
     আমাদের মুসলিম সমাজে অহরহ একটি কথা উচ্চারিত হতে শোনা যায়- ঐক্যের অভাবে মুসলমান সমাজ পিছিয়ে পড়ে আছে। কথাটি মিথ্যাও নয়। কিন্তু কেন? এমনটা তো হবার কথা ছিল না। 
     বলা হয়েছে ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি মৌলিক বিধান। কালিমা শাহাদাত- অর্থাৎ একমোবাদ্বিতিয়ম আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস। দ্বিতীয়- সালাত, বা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ আবশ্যিকভাবে আদায় করা। তৃতীয়ত রমযান মাসে সিয়াম বা রোযা পালন। চতুর্থ, সামর্থ্যবানদের উপর নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক যাকাত আদায় করা। এবং সামর্থ্যবানদের উপরই জীবনে একবার হজ্জ আদায় করা। 
     আলহা'মদু লিল্লাহ, এই পাঁচ মৌলিক কর্ম আমরা ভালোই জানি এবং মেনেও চলি। কিন্তু মুশকিল এবং আফসোসের বিষয় হলো- ইসলামকে আমরা এই পঞ্চক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। ঈমানদার বলে আমরা দাবি করি, আল্লাহপাকের একত্ব নিয়ে নিঃসন্দেহে আমাদের পূর্ণ ঈমান রয়েছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে আল্লাহর রাসূল- সে কথাও আমরা নির্দিধায় মেনে চলি। কিন্তু যে জীবনবিধান আল্লাহর রাসূল আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন, তাকে আমরা নিজেদের জীবনে কতোটা প্রতিপালন করে চলেছি, তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা কতটুকু করে থাকি? 
     ঈমানদারের জন্য প্রথম যে কর্মটি আবশ্যক বলা হয়েছে, তা হলো সালাত আদায় করা। এবং তার যথোচিত যে পন্থা আল্লাহর রাসূল সারাজীবন ধরে প্রয়োগ করে দেখিয়ে গেছেন, তা হলো পাঁচ ওয়াক্তের ফরজ নামাজ মসজিদে জামায়াতের সঙ্গে আদায় করা। উদ্দেশ্য- মহল্লার সকল মানুষ প্রতিনিয়ত একাধিকবার পরস্পরের সাথে দেখাসাক্ষাৎ করবে, সৌজন্য বিনিময় করবে। এবং সেই সঙ্গে খবরাখবর নিতে পারবে কারও ঘরে কেউ কোনোও ধরনের অসুবিধা অসুখ বিসুখ ইত্যাদি সমস্যায় রয়েছেন কি না। যদি সেরকম কিছু হয়, ব্যক্তিগতভাবে হোক অথবা সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্কট নিরসনে সহযোগী হয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করা। 
     সেই সঙ্গে নাবী জীবনের আরও একটি আদর্শ এবং দিকনির্দেশনা ছিল- প্রত্যেক মানুষ তার প্রতিবেশীর হকের প্রতি সচেতন থাকবে। সেই প্রতিবেশি মুসলমান হোক বা না, বলা হয়েছে প্রতিবেশি যদি অভাবের তাড়নায় অভুক্ত হয়ে ঘুমোতে বাধ্য,হয় তাহলে পেটপুরে খেয়েদেয়ে সারারাত ইবাদাত বন্দেগী করলেও তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তার চাইতেও বড় সাবধান বাণী উচ্চারণ করে গেছেন আল্লাহর রাসূল- বলা হয়েছে ধনীদের মধ্যে অবস্থান করেও যদি কোনো ঘরে কেউ ক্ষুৎপিপাসার তাড়নায় মৃত্যুবরণ করে, সেই ঘরের চতুর্দিকে বসবাসরত চল্লিশ চল্লিশ ঘরের কারো কোনো ইবাদাত বন্দেগী ক্ববুল হয় না ! 
     এবার বলুন- বুকে হাত দিয়ে বলুন, ঈমানদার তো বটে আমরা, কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত এই জীবনধারায় আমাদের জীবন কতোটা উত্তরিত ? দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ আদায় ঠিকই করছি, রমযান আসার আগে থেকেই রোযা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছি, সদক্বা, ফিতরা,যাকাতও সময়মতো আদায় করে যাচ্ছি, হজ্জ হয়তো একাধিকবার ও পালন করে এসেছি, সময় সুযোগে ওমরাহ পালনেও পিছিয়ে নেই। কিন্তু যা সাধারণভাবে আমাদের মধ্যে নেই, তা হলো ঘরের মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে সম্বন্ধ বিঘ্নিত, পাড়ার সবাই আমাকে উচ্চ সম্মান দেয়না মনে করে মসজিদে জামায়াতে সালাত আদায়ের জন্য যাই না। গেলেও আমার মাতব্বরি খাটে না বলে ঝগড়া ফ্যাসাদে লিপ্ত হয়ে পড়ি। খবর জানিনা এবং জানার আবশ্যকতাও বোধ করিনা মহল্লার কেউ কোনো অসুবিধা বা সঙ্কটের মধ্যে রয়েছেন কি না। কিন্তু বড় বড় জলসায় ডাক পেলে অবশ্যই উপস্থিত হই, এবং সম্মানজনক দাতা হিসেবে আমার নামডাক ও রয়েছে বহুলভাবে। 
     আবার মহল্লার কমিটির যারা মাতব্বর হয়েছেন, তারা যেন এক একজন নবাব সলিমুল্লাহ! অমুক আমার বশংবদ নয়, তাই তার কোনও পরামর্শ শুনবো না- সে যত উত্তমই হোক না কেন! তমুকের কোনো দান মসজিদের জন্য গ্রহণ করা যাবেনা- যেহেতু উনার অমুক কাজ আমার পছন্দ নয়- ইত্যাদি। তার উপর রয়েছে কথায় কথায় একঘরে করে দেবার প্রবণতা। প্রায় প্রতিটা মহল্লায় এরকম ঘটনা রয়েছে যেখানে সামান্য অজুহাতে দুচার পরিবারকে একঘরে করে রেখে দেওয়া হয়েছে।  
     বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উলামায়ে কেরাম আমাদের ক্বোরআন হাদীস থেকে কতো মূল্যবান বাণী শুনিয়ে থাকেন, কিন্তু আমরা তা জীবনে বাস্তবায়ন করতে না গিয়ে বরং তার উল্টো পথে ধাবিত হই, অথচ আফসোস করি আমাদের আপদ বিপদ কেন ছাড়ছে না, বারবার কেন আমাদের উপর মুসিবাত ঝাঁপিয়ে পড়ে ? আলীমদের মুখে আমরা শুনি আল-ক্বোরআনের সেই অমোঘ বাণী- তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত করে ধরে রেখো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না ! আমরা শুনেছি উলামায়ে কেরাম বলেছেন- শরীয়তের হুকুম ব্যতিত এক মুমিন আরেক মুমিনের সাথে কথাবার্তা বন্ধ রাখলে চতুর্থ দিন থেকে তার কোনও বন্দেগী মক্ববুল হয় না ! এবং এ ও বলতে শুনেছি- জলে এবং স্থলে যত প্রকার মুসীবাত পরিদৃষ্ট হয়, তা মানুষেরই হাতের অর্জন! 
     আসুন, একবার ভাবি, আমাদের করণীয় কি ছিলো,আর আমরা করছিটা কী ? আমাদের কোন স্তরের মর্যাদা পাবার কথা ছিলো, আর হাসিল হচ্ছেটা কী ? আমাদের চারপাশের অনাকাঙ্ক্ষিত স্থিতি-পরিস্থিতির জন্য আমাদেরই কৃতকার্মই কি দায়ি নয় ? 
                            ২৯-০৩-২০২১ 

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।