পরিতৃপ্তি
পরিতৃপ্তি
°°°°°°°°°
-আ,ফ,ম, ইকবাল॥
সাতসকালে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। অপরিচিত নম্বর। কিছুটা বিরক্তি নিয়েই ফোনটা ধরলাম। ও পাশ থেকে এক মহিলা কণ্ঠ।
- আস-সালামু আ'লাইকুম আঙ্কেল, আমি সাবিনা বলছি, সাবিনা, চিনতে পাচ্ছেন ?
- সাবিনা, মানে সাবিনা, কোন সাবিনা বলছো ?
- ভুলে গেলেন আঙ্কেল, ওই যে দুইবছর আগে গৌহাটি থেকে আসার পথে ট্রেনে দেখা হয়েছিল। মায়ের সাথে আসছিলাম আমরা, জনশতাব্দি এক্সপ্রেসে ! আমার ছেলে মাণিক আপনাকে খুব জ্বালাতন .......
- ওহ হো, মনে পড়েছে বেটা। কি খবর ? তোমার মাণিকলাল কি করছেন? আমাকে তার মনে পড়ে?
- আঙ্কেল, সে এখন তার দাদা বাড়ি থাকে। আর আমি ....
- আমি মানে, তুমি কি তার সাথে ...... ?
- না আঙ্কেল, সেদিন আপনি মাকে কি কি যে বললেন! গৌহাটি ফিরে তিন মাসের মধ্যে বিয়ে ঠিক করে আমাকে ফের বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ের পর রাশিদের ট্রান্সফার হয়ে গেলো গোলাঘাট। আমরা এখন গোলাঘাট রয়েছি । জানেন আঙ্কেল, গত রোববার আপনার এক নাতনি হয়েছে ! আমাদের মেয়ে ! আপনার নম্বরটি আমার কাছে ছিলনা। নইলে সেদিনই আপনাকে খবরটি জানাতাম। গতরাতে মা এসে পৌঁছেছেন আমাদের এখানে। তাঁর মোবাইল থেকে নম্বরটি নিয়ে আপনাকে ফোন করলাম। সকাল সকাল আপনাকে ডিস্টার্ব করলাম না তো । কিন্তু আমার যেন তর সইছিল না !
- বুঝতে পারছি বেটা, এতো সুন্দর খবরটি দিয়ে ডিস্টার্ব কেন, আমার দিনটি তুমি আনন্দঘন করে দিলে । তোমার কুইন ভালো থাকুক, সে মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক। তা তোমার ..... ।
- এই নিন আঙ্কেল, মায়ের সাথে কথা বলুন।
সত্যিই, খবরটি ছিল আমার কাছে এক বিরল আনন্দদায়ক বিষ্ময়কর সংবাদ। কেন বিষ্ময়কর, বলি তার প্রেক্ষাপট।
বছর দুয়েক আগের কথা। আগের দিন অফিসের কাজকর্ম শেষ হয়েছে। কিন্তু রাত বারোটার ট্রেনে জার্নি করার মতো মন ও শরীরে তাকত ছিল না। তাই ভোরের জনশতাব্দির টিকিট কেটে রাতের মতো হোটেলে বিশ্রাম নিলাম।
সকাল ছয়টায় ছাড়লো যোরহাটগামী জনশতাব্দি এক্সপ্রেস। খিড়কির পাশেই ছিল আমার সিট। বগির একেবারে মাঝখানের সিটে। মাঝখানে টেবিল। সামনের সিটে এক বছর পাঁচেকের দুষ্টু দাদুমণি, তার মা, মামা আর নানী। ট্রেনে বসেই সেই দাদুমণির চাই পাশের সিট- যেখানে তার মা বসে আছে। একেবারে জানালার পাশে ওকে বসাতে তারা রাজি নয়, বলা যায়না হাত বাইরে ছড়িয়ে দেবে। টানাহেঁচড়া সে কিন্তু করছেই। ভাগ্যিস আমার সিটে একজন যাত্রী কম। দায়ভার নিয়ে তাকে আমি বসিয়ে দিলাম আমার সিটে। শর্ত রাখলাম- হাত বাইরে বের করা চলবে না। একদম ভদ্রলোকের মতো তিনি সম্মতি প্রদান করলেন। এরপর যত্তসব খুনসুটি আমার সাথে । নাম বললেন- ইফতিকার বাহার মাণিক। বুঝলাম ঘরে সবাই মাণিক বলে ডাকেন, এটি হয়ে গেছে তার নামের সাফিক্স ।
ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু হলো মাণিকলালের মা আর নানীর সাথে। সচরাচর যা হয়- কোথায়, কেন যাচ্ছেন, ইত্যাদি। প্রথমে আমারটা বললাম। এরপর তাদের কথা। উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো আমার কাছে এক হৃদয়বিদারক কাহিনি।
সাবিনার বাবা চাকুরি করেন গৌহাটির একটি অফিসে। ভালো পদ। সামান্য মাটি কিনে ঘরদোর করেছেন হাতিগাও। তিন সন্তানের বড়ো সাবিনা। মেজোটিও মেয়ে। ডিগ্রি ফাইনাল সেমিস্টারে পড়ছে।ছেলে ছোট। এইচএস ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। বছর ছয়েক আগে সাবিনার বিয়ে হয়েছিল আসাম সেক্রেটারিয়েটের কেরানি একটি ছেলের সঙ্গে। বাড়ি তাদের হোজাই। খুব ভদ্র এবং সম্ভ্রান্ত পরিবার। সবদিক দিয়ে উপযুক্ত পাত্র পেয়ে যাওয়ায় গ্রেজুয়েশন কম্পলিট হবার আগেই বিয়ে দিয়েছিলেন সাবিনাকে। বছর খানেক পরেই উভয় পরিবারের আলোক হয়ে জন্ম নিয়েছিল এই টুকটুকে মাণিক। বাবা মায়ের কোলের মাণিক তো বটেই!
কিন্তু এই খুশি টিকলো না খুব বেশি দিন। ছেলের জন্মের চারমাস পরই মাত্র তিন দিনের জ্বর নিউমোনিয়ার রূপ ধরে জামাই আলতাফকে নিয়ে গেলো না ফেরার দেশে! আকাশ যেন ভেঙে পড়লো সাবিনার মাথায় ! কিন্তু বিধির বিধানের কাছে সবাই মজবুর। মেনে তো নিতেই হয়!
শেষ পর্যন্ত উভয় পরিবারের সম্মতিক্রমে সাবিনা আর তার সন্তান ঠাঁই পেলো তার বাবা-মায়ের কাছে। গৌহাটি থাকার একটি বাড়তি সুবিধা, এখানে থেকে ফেমিলি পেনশনের কাজকর্ম করে নেওয়াটাও হবে সুবিধাজনক। এমনি করে দিন গুজরান হচ্ছিলো সাবিনার। মাণিকের বয়স সাড়ে তিন বছর হবার পর থেকে তার দাদা দাদি চাপ দিচ্ছেন তাকে আর তার মাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। স্কুল ভর্তি করতে হবে যে। -আরোও কিছুদিন যাক, নার্সারি ক্লাস নাহয় এখানেই করে নেবে। ঘরের পাশেই একটি নার্সারি স্কুল রয়েছে। এসব বলে আরোও বছর দুয়েক কেটে গেছে। এবার ক্লাস ওয়ান পাবে। তাই মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়ি আর নাতিকে তার দাদা দাদির কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছেন সাবিনার মা। তার বাবার ডিউটি থাকায় তিনি আর যেতে পারছেন না যেহেতু।
কাহিনি এতটুকুই। শুনে আমার মনটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠলো! এই কচি মেয়েটাকে এক অনিশ্চিত অন্ধকার জীবনের পথে বিসর্জন দিতে যাচ্ছেন স্বয়ং এক মা!
অনেক্ষন চুপচাপ বসে রইলাম। কিন্তু ভাবলাম এই মুহূর্তে আমার মনের মধ্যে উথলে উঠা ভাবনাটা ব্যক্ত করতেই হবে। নইলে বাকি জীবনটা নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে হবে। তাই কথা শুরু করলাম, ধীরে ধীরে।
-আচ্ছা দিদি, সাবিনার বয়স কত হয়েছে!
উত্তরটা সাবিনাই দিলো।
-আঙ্কেল, নাইনটিন নাইন্টি টু তে আমার জন্ম।
আবারও খ্যাঁক করে উঠলো আমার হৃদয়! এ যে আমাদের মেয়ের সমবয়সী! একই বছরে জন্ম! আমাদের মেয়েকে বিয়ে দিতে কিছু বিলম্ব হয়েছে, ওর পড়াশোনা শেষ করতে গিয়ে। সাবিনার নসীবে উচ্চ শিক্ষা জুটেনি, কিন্তু বিয়েটা জুটে গিয়েছিল অনেক আগেই। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাতৃত্ব। কিন্তু নসীবে জুটলো না স্বামীর সঙ্গে সংসার করা! সে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর মর্জি! কিন্তু বান্দারা এ কি করছেন ! একটি তরতাজা ফুল্ল মেয়েকে চিরদিনের জন্য ঠেলে দিতে যাচ্ছেন এক অনিশ্চিত নিঃসঙ্গ জীবনের পাঁকচক্রে !
আমার চিত্তে চেতনায়, মন-মননে ভেসে উঠলো আমাদের মামনি আর নাতনি আরফার চেহারা ! মাত্র মাসছয়েকের মেয়ে, স্বামী, শ্বশুর শাশুড়ি সংসার নিয়ে আমাদের মামনির পরিতৃপ্ত মুখাবয়ব দোলা দিতে লাগলো আমার দুই চোখের দৃশ্যপটে! এবার ঠিক চোখ তুলে তাকালাম সাবিনার দিকে! জানিনা কেন, মুহূর্তের মধ্যেই আমার দুটি নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো !
কথায় ফিরলাম মাণিকের নানীর সাথে।
- আপনারা কি সাবিনাকে চিরদিনের জন্য একাকী তার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে দিতে চাইছেন?
- একাকী কেন ভাই, তার সোনামনি, তার কোলের সন্তানটিকে নিয়েই তাকে থাকতে হবে! ভাগ্যের বিড়ম্বনা যা ঘটে গেছে, তা কি আর আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো! বাচ্চাটির ও তো চাই তার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে আপন পরিচয়- তার ঠিকানায়, তার পৈত্রিক ভিটায়! তাছাড়া, তাকে যথোপযুক্ত লালন পালনের জন্য রয়েছে তার মায়ের পেনশন। হ্যাঁ রে আমীন, ফেরার পর মনে করিয়ে দিস সাবিনার পেনশন ট্রান্সফারের কাগজপত্র তাড়াতাড়ি অফিসে জমা দিতে হবে। তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলে আগামী মাস থেকেই তার পেনশনটা হোজাই ট্রেজারিতে চলে যাবে। হ্যাঁ ভাই, বলছিলাম, আমরা কি আর করি, সবই নসীব। এতো ভালো পাত্র, এতো ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিলাম মেয়েটাকে, কিন্তু আল্লাহর মর্জি হলোনা , এই সুখ তার কপালে সইলো না! আমাদের যতটুকু করার করলাম, এবার মেয়েকে নিজের সংসারে তো যেতেই হবে! পতি না থাক, সে যে তার পতিগৃহ । তাছাড়া, আমাদের ছোট মেয়েটির পড়াশোনা শেষ হবার পথে। তার বিয়ের জন্যও আমাদের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। তাদের বাবার রিটায়ারমেন্টের মাত্র দুই বছর বাকি। ছেলেটাও রইলো এখনও মাঝপথে! কি আর করি ? সবই আল্লাহর মর্জি!
শুনলাম অনেক্ষন ধরে 'আল্লাহর মর্জি'র এই বাখান ! মেজাজ ধীরে ধীরে বদতর হচ্ছিলো আমার! কিন্তু মহিলা বলে কথা! অপরিচিত সহযাত্রী! কথা তো বলতেই হবে! কিন্তু নিজেকে বললাম- বেটা, মুখ সামলে !
- আচ্ছা দিদি, মেয়েটাকে এভাবে ছেড়ে থাকতে আপনাদের কষ্ট হবেনা? বিশেষ করে এই মণিকলালকে? ততোক্ষণে আমি ওর নতুন নামকরণ করে নিয়েছি ।
- কষ্ট তো হবেই। আমাদের যেমন কষ্ট হবে, তাদের ও নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু এ যে বিধির বিধান। ধীরে ধীরে সবাইকে মানিয়ে নিতেই হবে!
এবার আর পারলাম না !
- আচ্ছা, আপনি যে বারবার 'বিধির বিধান', 'আল্লাহর মর্জি' বলছেন, আপনি নিশ্চয় এটাও জানেন বিধি অন্য কিছু বিধানও দিয়ে রেখেছেন। যেমন এরকম কোনো মেয়ে কম বয়সে বিধবা হয়ে গেলে তার জন্য রয়েছে পুনর্বিবাহের বিধান । দৈব দূর্বিপাক ঘটে গেলে যে বিধানের মাধ্যমে একটি মেয়ে ফিরে পেতে পারে তার জীবনের একটি নিরাপদ আশ্রয়, তার জীবনের কোনও এক একান্ত আপনজন। যার কাছে সে জীবনভর শেয়ার করতে পারে তার আনন্দ বেদনা, তার সুখ দুঃখ, তার মনের সকল অভিব্যক্তি!
তাছাড়া, আপনি যে বলছেন সে তার পতিগৃহ আর তার হাতে থাকবে ভরণপোষণের জন্য পেনশনের টাকা, সে ভালো কথা। কিন্তু যে ঘরে পতি নেই, সেই ঘরকে জবরদস্তি পতিগৃহ বলে নিজের মেয়েকে ধোঁকার মধ্যে রাখতে চাইছেন বলে কি আপনার একবারও মনে হয় না ? আমি তো ভাবছি তার উল্টোটা, যেমন .....
-কি, কি বলতে চাইছেন আপনি উল্টোপাল্টা? যতসব অলক্ষুণে কথাবার্তা !
বাপরে, এ যে দেখি একেবারে রেগেমেগে ব্যাপার! খানিক ঘাবড়ে গেলাম! সত্যিই তো, তাদের মেয়ে, তারা যা ভালো মনে করছেন, তা ই করতে যাচ্ছেন! আমি কেন .........
আ....রে, আশ্চর্য ! যাকে নিয়ে কথাবার্তা, হঠাৎ তার দিকে চোখ পড়তেই দেখি মা যখন রাগে গরগর করতে শুরু করেছেন, তখন মেয়েটি মুখ লুকিয়ে হাসছে। চোখাচোখি হতেই কিছু একটা হালকা ইশারা করলো! জানিনা ঠিক কি বলতে চাইছিলো, কিন্তু আমার অন্তর বলেছে মেয়েটিকে যেন তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলির বকরী করা হচ্ছে !
ইতিমধ্যে ট্রেন পৌঁছে গেছে চাপারমুখ জংশন। সঙ্গে সঙ্গে হকারদের হুড়মুড়। আমি বিশ্ববিখ্যাত চাপারমুখী সিঙাড়ার এক 'মছা'(জানেন তো, সারা বিশ্বের মধ্যে কেবল এই চাপারমুখ স্টেশনে আজও পাওয়া যায় দশটাকায় দশটি সিঙাড়া) মাস্টার মাণিকের হাতে তুলে দিয়ে প্ল্যাটফর্মের দোকানে চা খেতে নেমেছি। চায়ের কথা দোকানিকে চায়ের কথা বলতে না বলতেই দেখি পাশে সাবিনা !
-আঙ্কেল, ওরা আমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে জোর করছে আমার এই পেনশনের জন্যই। গ্র্যাচুইটির টাকাগুলো আমি তুলিনি। আমার মনে হয় বাড়ি গেলেই সেই টাকাগুলো তুলার জন্য ওরা চাপ দেবে- যেহেতু ঘরের কাজ আজও মাঝপথে লটকানো।
-এতোসব জেনেশুনেও তোমার মা-বাবা .... ?
-আঙ্কেল, তাদের এখন মাথাব্যথা খালি হাসিনা আর আমিনকে নিয়ে। আমি নাকি অলক্ষ্মী মাগি ! স্বামী খেকো- বলেই মুখ ঢেকে চলে গেলো ট্রেনের দিকে !
ট্রেন ছুটে চলেছে তুফান বেগে, যেহেতু এটিই এই রুটের দ্রুততম ট্রেন- যার গতিবেগ রাজধানী এক্সপ্রেস গুলোর চাইতেও অধিক। ঠিক সমভাবে পাল্পিটেশন চলছে আমার মনের মধ্যে! সময় আর খুব বেশি নেই । মেয়েটি দুই কথায় অনেক কিছু বলে দিলো। এবার আমি কি করতে পারি তার জন্য? না, কিছু কথা আরও বলতেই হবে !
- আচ্ছা দিদি, কিছু মনে করবেন না, একটি কাজ করা যায়না- সাবিনা আর তার ছেলেকে আপনাদের পাশাপাশি একটি ছোট্ট ভাড়াঘর রেখে দিয়ে গৌহাটিতেই নাতির পড়াশোনা করানো যায় না? তার পেনশন আছে, নিজে নিজেই চলতে পারবে। আর আপদে বিপদে আপনারা তো পাশাপাশি থাকবেন ই। কথাটি এজন্য বলছি, আইন বলে কি জানেন, এক মা চাইলে সন্তানকে তার পাশে রাখতেই পারে, যদি তার পরিবারের মর্যাদা অনুসারে পঠন পাঠনের ব্যবস্থা করে থাকে। আর সবাই জানে একথা যে হোজাই থেকে গৌহাটিতে পড়াশোনার পরিবেশ অনেক উন্নত। তাই বলছিলাম আর কি। তাছাড়া আমার মনে হয় শ্বশুরবাড়ি গেলে পেনশনের টাকায় ওর যেমন দখল থাকবে না, তেমনি শ্বশুর শাশুড়ি নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবেন একটি হোলটাইম কাজের মেয়ে পেয়ে গেলে ! আপনি কি ভাবেন ?
গোখরো সাপের ফণা তুলা দেখেছিলাম একবার এক সাপুড়ের খেলা দেখাবার সময়! চলতি ট্রেনের মধ্যে আজ তার অভিনব রূপ দেখতে পেলাম!
- আপনি কেন আমাদের পারিবারিক বিষয় নিয়ে এতো মাথা ঘামাচ্ছেন? আপনাকে কি কেউ আমার মেয়ের উকিল নিযুক্ত করেছে যে আইন নিয়ে তর্ক শুরু করে দিলেন? এমনিতেই মাগি খেকোটার জ্বালায় জ্বলেপুড়ে মরছি! তাই চাইছি কোনোমতে মেয়েটিকে তার ঠিকানায় পৌঁছে দিলে রেহাই! আপনি আবার বলছেন সাপের মুখে ব্যাঙের মতো মেয়েটাকে সাজিয়ে রাখি !
নতুন রহস্যের সন্ধান ! কিন্তু মোড়ক খুলবো কি করে ?
-মানে ওর কি বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে কেউ ? বলুন না, রাগ করছেন কেন? আমি তো পথের মানুষ, পথের কথা পথেই ছেড়ে চলে যাবো ।
- হ্যাঁ, ওই আমাদের সিজুবাড়ি রোডেই থাকে রশিদ না কি যেন নাম। আমাদের শিলচরেরই মানুষ। কোন এক অফিসের আধনা কেরানী। বাচ্চা জনম দিতে গিয়ে বৌটা মারা গেছে। বাচ্চাটির আর জন্মই হলোনা! সেই মাগিখেকোটি বছর খানিক ধরে এখানে ওখানে চক্কর কাটছে- বলছে সাবিনাকে তার সাথে বিয়ে দিলে ছেলেটার দায়ভারও সে নিয়ে নেবে। বলুনতো, এমন মাগিখেকোর হাতে আমাদের মেয়েটিকে কি করে তুলে দিতে পারি ? জানিনা ক'দিন পরই ওকেও না খেয়ে ফেলে !
- তাজ্জব! কারো কোনো নিকটাত্মীয় মরে গেলেই বুঝি ও 'খেকো' হয়ে যায়? তার মানে নিশ্চয় আপনাদের মেয়েও স্বামী-খেকো !
- নয় তো কি ?
- আচ্ছা, তাহলে আপনার কি মা-বাবা জিন্দা আছেন? আপনার শ্বশুর শাশুড়ি ?
- চিরকাল কি কেউ জিন্দা থাকে? ওরা সময়মতো মারা গেছেন। বুড়ো হয়ে ।
- বুড়ো হয়ে মারা গেলেও আপনারা থাকতেই তো মারা গেছেন। তার মানে আপনারাও মা-খেকো,বাবা-খেকো, শ্বশুর- ...... !
- কি, কি বলতে চাইছেন আপনি?
- যা আপনি বললেন, ঠিক তা ই বলছি ! নয় কি ?
মা'কে এভাবে জব্দ হতে দেখে,কেন জানিনা সাবিনা মুখ বাঁকিয়ে মাথাটা ঝাঁকিয়ে দিলো একবার।
-শুনুন, দিদি, এভাবে নিকটাত্মীয় মরে যাবার জন্য কাউকে দায়ী করা মোটেই উচিত কথা নয়। আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন আপনার জামাই মারা যাবার জন্য আপনার মেয়ে কোনোভাবে দায়ী? নাকি জগতের কেউ যদি চরম ব্যথা পেয়ে থাকে সেই মানুষটি মরে যাবার জন্য, তাহলে সবচাইতে ব্যথিত হয়েছে এই মেয়েটি, যে স্বামীকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জগতের সব সুখ হারিয়ে ফেলেছে! ঠিক সেইভাবে একজন পুরুষ যদি অকালে তার স্ত্রীকে হারায়, তার চাইতে বেদনা গ্রস্থ মানুষ আর কে হতে পারে! একবার আপনার নিজের কথা ভাবুন তো, খোদা না খাস্তা যদি ....
-কিচ্ছু বলবেন না আর! না, একটি শব্দও নয় আর !
বুঝতে পারলাম নরম জায়গায় হাত পড়ে গেছে। তাই মুড ঘোরানোর জন্য বললাম-
-না, মানে বলছিলাম, একটি মেয়ের জন্য সম্মানের জীবন যাপনের জন্য চাই একজন মানুষ, যে হবে একান্ত আপনজন ! একজন মহিলা হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই জানেন মেয়েদের এমন কিছু কথা, এমন কিছু বেদনা আছে, যা কেবলমাত্র একজন মানুষ ছাড়া জগতের আর কাউকে বলতে পারে না- এমনকি মা-বাপকেও নয়! ঠিক বললাম না কথাটা ?
-হ্যাঁ, ভাই আজ নিজেকে বড় নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে, ভীষন স্বার্থপর মনে হচ্ছে ! এভাবে কোনো দিন ভাবিনি। কেউ এভাবে আলোচনা ও করে নি ! তাই ক্রমশ যেন হিংস্র হয়ে উঠেছিলাম মেয়েটির প্রতি! এমন সুঠাম সুন্দর সুশীল জামাইকে হারিয়ে বারবার মনে হয়েছে এই কাল নাগিনী ই খেয়েছে ছেলেটিকে ! বলেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন নিজের মেয়েকে- হয়তো অনেককাল পরে !
হাফলং,
০৮-৯-২০২০
Comments
Post a Comment