মতিহারা অনিতা
মতিহারা অনিতা
সত্যিই বেদনাদায়ক ! আজ ফের দেখা হলো সেই ভদ্র মহিলার সাথে- যাকে প্রায়ই দেখা যায় পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিড়বিড় করে কিছু বকছে শুধু শুধু!
আজকের দেখা মানে শুধু সাক্ষাৎ নয়, একেবারে পথ আগলে দাঁড়ালো একেবারে রাস্তার মাঝখানে ! হর্ণ বাজিয়ে কাজ হলো না। অবশেষে গাড়ি ব্রেক করতে হলো। যেইনা ব্রেক কষেছি, অমনি জানলার কাছে এসে নালিশ শুরু! নেপালি ভাষায়। -হাজুর, আপ বিচার....., এটা কি ঠিক করলো মানুষটি, আমার সাথে এত দুর্ব্যবহার কিভাবে করতে পারে ? আমি তো তাকে ভালোবেসেছিলাম, ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম! দেবী'মা কে সাক্ষী রেখে, কালী মন্দিরে গিয়ে। আর তার কি পাপ লাগবে না ? তার কি বিচার হবে না ?
নেপালি ভদ্রমহিলা। বিবাহিতা। জ্বলজ্বলে সিঁদুর সিঁথি ভর্তি। বহুদিন ধরে দেখছি এভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। আজ যখন নালিশের ফোয়ারা ছোটাচ্ছিল, পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আমাদের ছেত্রী স্যার। উনি কিছু বললেন ভদ্রমহিলাকে- নিজেদের ভাষায় । পথিক আবার পথ ধরে এগিয়ে গেলো। স্যারকে বললাম- উঠে পড়ুন গাড়িতে। ঘর পর্যন্ত ছেড়ে দেবো আপনাকে। যেহেতু উনি স্থানীয় মানুষ, জানার আগ্রহ ছিল বিস্তারিত- ভদ্রমহিলা সম্বন্ধে।
বছর চারেক আগের কথা। লামা উপাধির ছেলেটি এসেছিল লংকা বা এরকম কোনও জায়গা হতে। প্রথমে হাজিরা করতো । এরপর অটো ড্রাইভার। অটো চালাতে চালাতে মেয়েটির সাথে পরিচয়। প্রেম, পরিণয়। গুছানো ঘর সংসার। মাঝে মাঝে ঘরে যেতো- আত্মজনদের খবরা-খবর করতে। মেয়েটি কখনো দেখিনি তার শশুর ঘর। নিয়ে যায়নি লামা কখনো। তিন বছরের সংসার। সন্তান-সন্ততি হয়নি। বারবার বলতো লামা- এখনো সময় হয়নি। আরো বছর দুয়েক পরে সন্তান নেবো। রুজি রোজগার করে সেট্যাল হতে হবে আগে। বছর তিনেকের মাথায় অনিতা জানতে পেলো, ঘরে লামার রয়েছে বউ-বাচ্চা। অশান্তির শুরুয়াত তখন থেকেই। কথা জানাজানি হবার কিছুদিনের মধ্যেই উধাও লামা। সঙ্গীদের বলে গেছে শিলিগুড়িতে কি একটা কাজ পেয়েছে, মাস ছয়েক পরে ফিরবে। এক দুই তিন চার মাস গত, কোনো খবর নেই । হঠাৎ একদিন কার্বি আংলং এর হাওয়াইপুর থেকে এক ভদ্রমহিলা তার ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে হাফলং উপস্থিত। খবর করে করে একেবারে অনিতার ঘরে।
-রাক্ষসী কোথায় আমার স্বামী, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস? তুইই তো কব্জা করে রেখেছিলে এতোদিন ধরে! বল, কোথায় লামা ?
অনিতা যতই বুঝাবার চেষ্টা করে, ভদ্রমহিলা আরোও উত্তেজিত হয়ে ধমকাতে শুরু করলো।
-এক্ষুণি বলে দেয় কোথায় লামা, নইলে আমি থানায় যাচ্ছি! তোর চৌদ্দ গুষ্টিকে ....... ! চিৎকার চেঁচামেচি যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, প্রতিবেশিরা এসে জড়ো হলো । উভয়কে নিয়ে যাওয়া হলো গাওঁবুড়ার ঘরে। গাঁওবুড়া বুঝিয়ে সুঝিয়ে আজকের রাত তাদের একসাথে কাটাতে বললেন। কাল সকালে বসবে বিচারসভা।
নির্দিষ্ট সময়ে আসর বসলো গাঁওবুড়ার ঘরে । অনেক লোক জড়ো হয়েছেন- গাঁওবুড়ার ডাকে। বস্তির মান সম্মানের কথা। সম্মানজনক সুরাহা একটা করতেই হবে।
লামার সম্বন্ধে কে কে জানেন- জিজ্ঞেস করতেই বেরিয়ে এলো নতুন আরেক অধ্যায়! বর্ষীয়ান ব্যক্তি বেদপ্রকাশ রাই খেদ ব্যক্ত করে বললেন, বলোনা এই শয়তানটার কথা ! আমার ছোট ছেলের শালি এসেছিল মাস ছয়েক আগে জলপাইগুড়ি থেকে। পুজোর সময় সবাই ঘোরাফেরা করেছিল এই লামার অটোতে করে। পুজোর পরে হঠাৎ করে দীপিকার খোঁজখবর নেই। অবশেষে জানা গেলো এই শয়তান লামাটাই দীপিকাকে বিয়ে করে নিয়ে গেছে জলপাইগুড়ি। উপায়ান্তর নেই দেখে সেখানে একটি মিলে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন দীপিকার বাবা। নিজেদের মান সম্ভ্রমের কথা ভেবে, সব জেনেও এতোদিন কিছু বলেননি তিনি। কিন্তু আজ দু-দুটি মেয়ের জীবন বরবাদ করে তৃতীয়জনের জীবন নিয়ে যে খেলা খেলতে শুরু করেছে লামা, এসব দৃশ্য দেখে তিনি নিজেকে আর সামলাতে পারেন নি!
এরপর ?
-এরপর আর হবার কি আছে! প্রথম পক্ষের বৌটি ফিরে গেছে নিজ ঘরে। ভাড়া ঘরের মালিক বখায়া ভাড়া পাবার আশা নেই বুঝে সেইদিনই ঘর ছাড়তে বললেন দীপিকাকে। ওদিকে দীপিকার মা'ও মারা গেছেন। ছোটভাই চলে গেছে নেপাল, তার পূর্বপুরুষের ভিটেয়।
দিকভ্রান্ত,মতিহারা, দিশাহারা দীপিকা তখন থেকে পথের সাথী !
Comments
Post a Comment