"চোরর মন খিরা খেতো"

  "চোরর মন খিরা খেতো" ! 
  
    একটি গ্রাম্য প্রবাদ রয়েছে- চোরর মনো খিরা খেত। এই প্রবাদের উপর একদল বিশেষজ্ঞ এক নাগাড়ে সাড়ে তেরো দিন গবেষণা করে আবিষ্কার করলেন প্রবাদটির প্রকরণ সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি! অবশেষে তারা ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে প্রবাদটির আসল এবং যথার্থ রূপ হবে "চোরর মন খিরা খেতো"! 
   এই তত্ত্ব আবিষ্কারের পর চার মূর্তি(চোর বিলকুল নয় কিন্তু) একবার সিদ্ধান্ত নিলো প্রবাদটির বাস্তব টেষ্টিং করে দেখতে- প্রবাদটির পরিমার্জন কি সত্যিই আবশ্যক ছিল? 
   তেরো দিন পর তারা সন্দেহাতীতভাবে অনুভব তথা উপলব্ধি করতে পারলো যে এই পরিবর্তন এক্কেবারে বাস্তব সম্মত! 
   কি করে? প্রেক্ষাপট জানা আবশ্যক। 
   শীতের মৌসুম। ফরমানদার তলায় অন্যান্য শাকসবজির সাথে প্রচুর খিরা ধরেছে- যা নিত্যদিন পাঠশালায় যাওয়া আসার পথে দৃষ্টি এবং লালসা গোচর হয়ে থাকে! তাদের, মানে ওই অ,আ,ই, এবং ঈ নামক চারমূর্তির ভরসা ছিল যেদিন ফরমানদাকে খেতের মধ্যে দেখা যাবে, সেদিন তারা তাঁর কাছে চেয়ে অন্তত এক একটা হলেও খিরা খেয়ে রসনা বিলাস নিভৃত করে নেবে।
   সেদিন সোমবার। ঘটনাচক্রে পাঠশালা যাবার পথে তারা দেখতে পেলো ফরমানদা খিরা বাগানে পানি দিচ্ছেন। আবেগ আপ্লুত হয়ে তারা যথোচিত সম্মানপূর্বক তাদের বাসনা ব্যক্ত করে ফললো ! ভাগ্যের কি পরিহাস! খিরা তো পেলোই না, বরং উল্টো বদনাম শুনতে হলো যে ওদের মতো লালচিদের নজর লেগে নাকি তাঁর খিরা পঁচতে শুরু করেছে! তাই তারা যেন আর কোনদিন 'খিরাডোবা'র দিকে দৃষ্টি না দেয়! চার মূর্তির দিমাগে খুব আঘাত দিলো অভিযোগটি। তাই তাদের মাথায় তক্ষুনি মনে পড়ে গেলো সেই বিশেষ বাক্যটি,যার প্রয়োগ করা মাত্র তাদের উপর শুরু হলো ঢেলা বৃষ্টি! উনি যগ রাগ করছেন,ততই তারা জোরে জোরে বলতে লাগলো দাদা ফরমান,দাদা ফরমান ! ফরমানদা ঠিক আছে, কিন্তু দাদা ফরমান বললে উনি যে জ্বলেপুড়ে উঠেন, সে জ্ঞান অন্তত তাদের ছিল ! 
   সেদিন পাঠশালা যেতে যেতে তারা এক চরম সিদ্ধান্ত নিলো- এই বদনামের প্রতিশোধ নিতে হবে- যে করেই হোক! পরিকল্পনা অনুসারে চারমূর্তি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বটগাছের আড়ালে জমায়েত হলো। এশার আজানের অপেক্ষা। আজানের খানিকক্ষণ পরই ফরমানদা বেরিয়েছেন মসজিদে যাবার জন্য। চারমূ্তির মধ্যে শলাপরামর্শ শেষে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো অ,আ, আর ঈ যাবে কর্ম সম্পাদনে। ই এদিক ওদিক হাটাফেরা করবে। যদি কোনো প্রকারের অশনি সংকেত দেবার আবশ্যকতা পড়ে, জোরে কাশি দেবে ! 
   অভিযান সবেমাত্র শুরু হয়েছে! হঠাৎ তিন মূর্তির 'কর্ণকুহরে শঙ্কেত ধ্বনি প্রবিষ্ট হইল' ! মার্চ বেকওয়ার্ড! হুলুস্থুল ! অ কোনক্রমে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে জানতে চাইলো সংকেতের কারণটা কি? 
   -কিসের সংকেত?
   - আরে, তুই যে কাশলি ? 
   - সে তো এমনি কাশি এসে গিয়েছিল, ডরে! কয়টা আনলি? 
   - এই দেখ- বলে লুঙ্গির আগাটি ছেড়ে দিল। আবছা আলোয় হাত দিয়ে দেখা গেল সাত সাতটি মাটির ঢেলা এবং কুল্লে তিনটি খিরা ! 
   - আরে ওরা কোথায় গেলো? তখনই ফরিদদার পুকুর পাড়ে শোনা গেল আ'র আর্তনাদ- তোমরা কইরে, আমারে উঠাও! উফ, বেচারা টপকি মেরে বেড়া পার হতে গিয়ে পা পিছলে একেবারে জবুথবু! কিন্তু ও কোথায়! ঈ ! কব্রিস্থানের দিক থেকে গোঙানির আওয়াজ ! ভদ্র  বাচ্চাগুলো চোরের মত গুটিগুটি এগিয়ে কবরের পাশে যেতে যেতে শুনতে পেলো, তোমরা কানো রে, আমারে উঠাও ! সকলে মিলে অবশেষে অবিনশ্বর দেহটিকে কবর থেকে পুনরুদ্ধার করে নিয়ে এলো! 
   এরপর যত গোঁসা উথলে উঠলো অপদার্থ ই এর উপর! এবং শাস্তি স্বরূপ সেই তিনটি খিরা অ,আ এবং ঈ ভাগ করে খেয়ে নিলো- ই এর বিলকুল সামনাসামনি ! 
   ই মনের দুক্কে মনমরা হয়ে 'স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিতে করিতে ভাবিল'- কাল ভোরবেলা প্রাতঃভ্রমণে ফরিদদার পুকুর পাড়ের ঐ জায়গাটায় একবার 'যাইতেই হইবেক' !
   

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।