সাধনার সার ।

সাধনার সার । 
                   -আ,ফ,ম, ইকবাল ॥
                   
গল্প বলি। আমেরিকার। 
আমেরিকার কোলরেডো প্রদেশে যখন প্রথম সোনার খনি আবিস্কৃত হলো, পুরো আমেরিকা সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়লো- এক এক টুকরো জমি কেনার জন্য- কেননা সেখানকার জমি খুঁড়লেই সোনা পাওয়া যায়। সবাই কিনলো নিজ নিজ সামর্থ্য অনুসারে। 
     জনৈক ক্রোড়পতি মিস্টার জন তার সারা সম্পত্তি লাগিয়ে কিনে ফেললেন এক পুরো পাহাড়। সবাই নিজেদের ছোট ছোট প্লটে ছোট ছোট মেশিন লাগিয়ে খনন শুরু করে দিলো। কারো অনেক ফায়দা হচ্ছে, কারো তুলনামূলক কম। 
     বড় জোতদার জন তার পাহাড়ে বড় বড় মেশিন লাগিয়ে আরম্ভ করলেন বড়ো মাত্রায় খোদাই কর্ম । কিন্তু ! কিন্তু বৃথা সবকিছু ! দিনের পর দিন, মাসের পর মাস- কনক নিষ্ক্রমণের লক্ষ্যণমাত্র নেই ! 
     হতাশ মহাজন জন ! সলাপরামর্শ করলেন পরিজনদের সাথে। কি করা যায় ? সব পুঁজি নিঃশেষিত প্রায়! নিষ্ফল ব্যয়ভার বেড়েই যাচ্ছে! অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন বিক্রি করে দেবেন নিথর নিষ্ফল পাহাড়টা। কিন্তু কে নেবে? কে আর অযথা বিনিয়োগ করবে এই পাথুরে পাহাড়ে- যখন সর্বত্র জানাজানি হয়ে গেছে এই স্বর্ণহীন পাহাড়ের কথা! 
     একজন ক্রেতা- মিস্টার ওয়েল এগিয়ে এলেন! কথাবার্তা খুব সাবধানে এগোচ্ছে। মিস্টার জনের ভয়- যে কোনো মুহূর্তে ভেস্তে যেতে পারে এই ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়া! আগন্তুক ক্রেতা হঠাৎ করে প্রশ্ন করে বসতে পারে- কে এমন পাগল জগতে রয়েছে যে এই পাথরের পাহাড়ে ইনভেস্ট করবে ? 
     ডিল অবশেষে ফাইনাল হলো। মাটি, পাহাড়, সকল হাতিয়ার পত্র, মেশিনারি সহ । হয়ে গেলো লেনাদেনা ও। এবার স্বয়ং জন জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার ওয়েলকে- কোন ভুতে তোমাকে পেয়েছ যে তুমি জেনেশুনে এই পাথরের পাহাড়ে টাকা ঢালতে গেলে ? তোমার পাগলামো আমার কাছে অবোধ্য!
     মিঃ ওয়েল ধীর স্বরে জবাব দিলেন- হতে পারে সাফল্য পাবার আগে তোমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। হতে পারে যেখানটায় সোনা রয়েছে, সেখানটায় তোমার পৌঁছা হয়নি। যেখানে তোমার খোদাই হয়ে উঠেনি, সেখানে যে সোনা থাকবে না, তা তো তুমিও নিশ্চিত হয়ে বলতে পারো না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আমার সাধ্যানুসারে আমি এবার আমার সাধনা করেই দেখি । 
     অভূতপূর্ব ফলাফল! যতদূর খোদাই হয়েছিল, তারপর মাত্র আরও দুই ফুট পর থেকে স্তরে স্তরে সাজানো সোনার আস্তরণ । অবশেষ পাহাড়ে কেবল সোনা আর সোনা ! গাড়ি গাড়ি সোনা বেরোতে লাগলো হরেক রোজ ! 
     সংবাদ পৌঁছে গেছে মিস্টার জনের কাছে ও। বেচারা আগেও কেঁদেছিল , এবার ও এসে বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলো! বললো- ভাই, তোমার ভাগ্য তোমাকে সঙ্গ দিলো বলেই তোমার কপাল খুলে গেলো! 
     মিঃ ওয়েল বললেন- না ভাই, এ শুধু ভাগ্যের খেলা নয়, সহনশীলতার তারতম্য। তোমার সহনশীলতা তোমাকে যে ফলাফল পেতে বঞ্চিত করেছে, সেই চ্যালেঞ্জ নিতে পারাটাই আমাকে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। 
    আমাদের জীবন পরিক্রমায় এধরনের ঘটনা অনেক ঘটে থাকে,যা আমরা কখনো উপলব্ধি করতে পারি, অধিকাংশ সময় তা রয়ে যায় অধরা। 
    আমাদের আশেপাশেই এমন অনেক রয়েছেন যারা হার মেনে যেখান থেকে ফিরে যাচ্ছেন, ঠিক তার কাছাকাছিই বিরাজ করছিলো সাফল্য। সে সাংসারিক বিষয়ে হোক অথবা আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে। খোদাই করতে করতে শ্রান্ত হয়ে যেখানে সাধনা গুটিয়ে নিচ্ছি, হয়তো আর মাত্র ক'ইঞ্চি দূরেই রয়েছে আমাদের প্রার্থিত বস্তু! যেমন ফিরে গিয়েছিলেন মিঃ জন- সফলতার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেও ! 
    জাগতিক ব্যাপারে সাধনার স্তর যতটা কঠিন হয়, আধ্যাত্ম সাধনার পথ কিন্তু ততোটা পাথুরে হয় না ! কেননা সেখানে পরম শক্তিধরকে আমাদের দেবার আছেই বা কি? তবু আমরা কঞ্জুসি করে থাকি পরম প্রভুর প্রতি নিবেদনের ক্ষেত্রেও। তা না হলে ছেঁড়া নোট কেন পাওয়া যায় মসজিদ মন্দিরের বাক্সে গুলোতে। 
    তাই আসুন, জীবনে যার সম্মুখে যে সাধনার জমি পড়ে রয়েছে, তার খোদাই করি পূর্ণ সহনশীলতা আর পরম প্রত্যয়ের সাথে। সাফল্য সর্বদাই ঢাকা পড়ে থাকে সাধনা-পর্দার আড়ালে । 
                        ০৬-০২-২০২১ 

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।