ছোট গল্প।
অসাফল্যও কখনো হয়ে উঠে সাফল্যের সোপান ।
গল্প বলি- রাজকীয়। কোথায় কখন পড়েছিলাম সে আর মনে নেই। তাই যতটুকু সম্ভব স্মৃতি হাতড়ে।
পূর্ব দেশীয় এক রাজা বার্ধক্যে পৌঁছে ভাবছিলেন কে হওয়া উচিত তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি। পরিজনদের মধ্যে সেরকম যোগ্য কাউকে মনে হচ্ছিল না। তাই ভাবলেন দেশের উঠতি যুবক সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে সৎ এবং বিশ্বাসী কাউকে নির্বাচন করবেন তাঁর উত্তরসূরি। কিন্তু কিভাবে হবে সেই নির্বাচন?
একদিন দেশের সকল যুবাদের ডাকলেন রাজদরবারে। প্রত্যেকের হাতে দিলেন একটি করে বৃক্ষবীজ। বললেন- বীজটি রোপণ করে একবছর ধরে তারা তার পরিচর্যা করবেন। আগামী বছর এই দিনে সবাই নিয়ে আসবেন তাদের উৎপাদিত চারা গাছটি। সেই চারাগাছের ফলনের উপর ভিত্তি করে তাদের মধ্যে থেকে কেউ একজনকে মনোনীত করা হবে সাম্রাজ্যের পরবর্তী রাজা হিসেবে।
সবাই বীজ নিয়ে চলে গেলো নিজ নিজ ঘরে। শুরু হলো পরিচর্যা। মাস তিনেক পর দেখাদেখি শুরু হলো কার চারা কতোটা বেড়েছে। একটি ছেলে- ধরুন নাম তার অরুণ, অনেক যত্ন সহকারে বীজ বপন করে নিয়মিত জলটল ঢালছে, কিন্তু তার টবে কোনো চারার দেখা নেই। ফুটলোই না কিছু। অন্য যুবকরা এসে অরুণের বীজের হালত দেখে হাসাহাসি করে, অরুণ নিশ্চুপ হয়ে মুখ বুজে সয়ে যায় শুধু। বেজার মুখখানা দেখে অরুণের মা তাকে শান্তনা দেন- দেখো বেটা, তোমার কর্ম তুমি করে যাচ্ছো,বীজ থেকে চারা ফুটছে না, তাতে তোমার তো কোনো ত্রুটি নেই। হয়তো বীজটাই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এতে মনক্ষুন্ন হবার কিছু নেই।
মাস ছয়েক যেতে না যেতেই কারো চারা অনেক বেড়ে গেছে।কারোটিতে ফুল ধরে গেছে,কারো চারায় ফলের মুকুল। দিন যত গড়িয়ে যাচ্ছে, অন্য যুবকরা যখন আহ্লাদে আটখানা হয়ে প্রহর গুনছে, অরুণ ততো সকরূণ হয়ে উঠছে!
অবশেষে নির্দিষ্ট দিন সমাগত। অরুণ তার মাকে বলছে সে রাজদরবারে যাবেনা। কোন মুখে খালি টব নিয়ে হাজির হবে! কে জানে রাজা কোন শাস্তির বিধান দেবেন তাকে। মা অরুণকে বোঝাচ্ছেন- দেখো বেটা, রাজাদেশ পালন করে দরবারে হাজির হওয়া আবশ্যক। বীজ থেকে চারা ফুটেনি, সেই দোষ তোমার নয়, তুমি তোমার কাজ করে গেছো। এবার সততার সাথে তোমার খালি টব নিয়েই রাজদরবারে যাওয়া কর্তব্য।
মায়ের কথায় অরুণ রওয়ানা দিয়েছে। সঙ্গে চলেছেন তার মা ও ।সারা পথ ধরে তাকে সইতে হলো সাথী যুবকদের অনেক ঠাট্টা বিদ্রুপ!
রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে সারি সারি সাজানো রকমারি চারাগাছ। অনেক সুন্দর ফুল, কিছু গাছে কলি মুকুল। সহাস্য মালিক দাঁড়িয়ে নিজ নিজ টবের কাছে।
পারিষদদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছেন রাজা। খুব তারিফ করছেন উৎপাদকদের। কারো পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। -আর কেউ বাকি নেই তো ? একেবারে শেষ প্রান্তে, এক কোনায় দেখতে পেলেন দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছেলে। সামনে একটি খালি টব। জড়সড় ছেলেটির পেছনে তার মা। হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ছেলের মাথায়।
রাজা তাকে ডেকে আনলেন সামনের সারিতে। প্রহরিদের আনতে বললেন খালি টবটি। ভয়ে ভয়ে মা এসেছেন সঙ্গে! অরুণ ছাড়া আর সকল যুবককে বাইরে বের করে দিতে বললেন প্রহরিদের।
অরুণ আর তার মাকে নিয়ে গেলেন রাজসিংহাসনে। মা-বেটাকে বসতে দিলেন উঁচু আসনে। সভাসদদের ডেকে বললেন- আপনারা একবছর ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন কে হবে রাজ্যের পরবর্তী রাজা। আসুন,আজ আমি পরিচয় করিয়ে দিই আপনাদের পরবর্তী রাজার সাথে। এই অরুণ হবে আমার এই রাজত্বের পরবর্তী রাজা। পুরো রাজত্বের যুবকদের মধ্যে একটি মাত্র যুবককে আমি পেয়েছি পুরোপুরি সৎ এবং নিষ্ঠাবান। আমি নিশ্চিত যে ওর হাতে রাজপাট যতদিন থাকবে, আমার এই রাজত্ব রইবে অম্লান, অক্ষত।
এরপর খুলে বললেন ঘটনার তাৎপর্য। গতবছর এই দিনে রাজা রাজ্যের প্রত্যেক যুবকের হাতে যে এক একটা বীজ দিয়েছিলেন, সবগুলো ছিল সিদ্ধবীজ, যে বীজ থেকে কখনও চারা ফোঁটা সম্ভবপর নয়। অন্য সবাই যখন দেখেছি নির্দিষ্ট বীজ থেকে চারা ফুটছে না, তখন তারা জালিয়াতির পথে হেঁটেছে। কেবল অরুণ টিকে রয়েছিল সততার উপর। তাই আজ আমি তাকে তার সত্যবাদিতা এবং সারল্যের পুরস্কার স্বরূপ আমার পরবর্তী উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করলাম।
২৭-০২-২০২১
Comments
Post a Comment