লক্ষ্ণৌ কি নাজাকত ।


লক্ষ্ণৌ কি নাজাকত। 
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°° 
                       -আ,ফ,ম,  ইকবাল॥
                       
     সে অনেক বছর আগের কথা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে এক ভদ্রলোক উঠেছেন আমাদের কামরায়। গায়ের পাঞ্জাবি, মোটা পায়ের ট্রাউজার আর কাপড়ের লম্বা ফিতার লটকানো ব্যাগ দেখেই মনে হলো নিশ্চয় কোনো কমরেড হবেন। জায়গা দিতে হলোনা, করে নিলেন। কমরেডরা বলতে খুব পারঙ্গম একথা সবারই জানা। ট্রেন ছাড়তে না ছাড়তেই ভদ্রলোক গল্প জুড়ে দিলেন। কত যে কর্মব্যস্ততা উনার, আজ যাচ্ছেন পাটনা। কাল ভোরেই পৌঁছতে হবে গয়া। বিরাট রেলী আছে কাল সেখানে- ইত্যাদি। 
     এরমধ্যে ক্রমে তুলে আনলেন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রসঙ্গ। এক ছেলে পড়াশোনা করছে জার্মানির বন-এ। মেয়ে ডাক্তারি পড়ছে চিনের কোন এক সর্ববিখ্যাত মেডিক্যাল কলেজে। ছোট ছেলেটার আবার পড়াশোনায় তেমন মনোযোগ নেই। কলেজে ভর্তি হয়েই পার্টি আর রাজনীতি নিয়ে মশগুল। অবশ্য তার এক গুণ- কোনো অন্যায় সহ্য করতে পারেনা, রুখে দাঁড়ায়- বলতে বলতে যেন নেতা মহাশয়ের বুক ফুলে উঠছিলো। অর্থাৎ বুঝা গেলো ছোটমিয়ার মধ্যেই তিনি তার নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন। 
     রাজনীতি, বিশেষ করে সর্বহারার রাজনীতি নিয়ে কেউ তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, বুঝতে পেরে এবার নিতে শুরু করলেন এক এক জনের ইন্ট্রোডাকশন, পরিবারের কে কি করেন, সন্তান সন্ততি, পড়াশোনা ইত্যাদির বিবরণ। যে যার যেমন বলে যাচ্ছেন। সময়ও কেটে যাচ্ছে গল্পগুজবের মাধ্যমে। 
     উপরের বাঙ্কারে শুয়েছিলেন লক্ষ্ণৌওয়ালা  শর্মাজী। গল্প শুনতে শুনতে আড়মোড়া ভেঙে এবার নিচে এসে বসলেন। কথা বলতে বলতে এক সময় এলো শর্মাজীর ইন্ট্রোডাকশনের পালা। শর্মাজী 'সওয়াল' শুনেই মুখ ঘুরিয়ে নিতে নিতে বললেন- ম্যাঁয় নির্ঝঞ্ঝাট হুঁ । 
     নেতা বাবু সহজে ছাড়বার পাত্র নয়। বারবার জিজ্ঞাসা- বোলিয়ে না আপকে বারে মেঁ কিয়া বোলনা চাহাঁ । 
     শর্মাজী ইতিউতি করে বললেন- আরে ভাই, জো খানা কভী মুহ মেঁ ঢালা হি নেহি, ক্যাসা বাতাউঁ উসকা সোয়াদ মিঠা হো ইয়া...... ! 
     এবার সবার আগ্রহই যেন বেড়ে গেলো। উদগ্রীব হয়ে নেতা বাবুর সঙ্গে আরও দুই একজন অনুরোধের সুরে বললেন- বোল দিজিয়ে না শর্মাজী, আপকে বারে মেঁ। 
     দুই পা সিটের উপর তুলে জানু মোড়ে বসলেন শর্মাজী। মনে হলো এবার ঝেড়ে কাশবেন। 
     -জব ম্যাঁয় জোয়ান থা, খুবই খুবসুরত ছিলাম। কত মেয়ের আর কত মেয়ের মায়ের স্বপ্ন ছিলো আমাকে পাকড়াও করবে- পতি আর প্রগতি হিসেবে পেতে। 
     কেউ একজন ফোড়ন কাটলেন- 'পতি' হিসেবে বুঝা গেলো, কিন্তু প্রগতি ? 
     -আরে ভাইয়া, উঁচা খান্দান ঔর উচ্চ বিত্তশালী পরিবার কা এক লোটা বেটা কোই কন্যা কে লিয়ে পতি হিসাব সে অগর পসন্দ হো, তো উসকি মা'জী কে লিয়ে প্রগতি কা জরিয়া কিউঁ নেহি বন স্যেকতা? 
     কাহিনীতে এবার যেন রস আসতে শুরু হলো। 
     কয়েকজন একসাথে বললেন- তো ফির? 
     শর্মাজী এবার বদন মোড়া দিয়ে বলতে শুরু করলেন- 
     -মুঝে ভি স্বপ্ন থা এক পরী কা জ্যায়সা সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে ঘর বাঁধবো, আমারও এক সুখের সংসার হবে, এক দো নান্না মুন্না- পর ........ ! 
     পুরো নিস্তব্ধ খোপের সব যাত্রী, শর্মাজীর 'পর'- এর পর-টা কি তা শুনতে। এদিকে শর্মাজী ও চুপচাপ! নেতা বাবুর আর তর সইছিলো না, তিনিই নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করলেন, শর্মাজী- পর ক্যা হুয়া ফের ? 
     মুচকি হেসে শর্মাজী বললেন- ওহ না সুনে তো বেহতর রহেগা! 
     এতো মজাদার স্পিডে চলা গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষে থেমে যাবে, তা কি কেউ মেনে নিতে পারেন? 
     সবাই অনুরোধ উপরোধ শুরু করলেন- আরে বোল দিজিয়ে শর্মাজী, সুননে সে কিসিকো কোই ফর্ক নেহি পড়েগা, বল্কি জরুর মজা আয়েগা। 
     -'কালেজ' এর জমানায় অনেক মেয়ে যেচে এগোতে চেয়েছে, কতজন চান্স খুঁজে পেরেন্টস এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কসম সে, কারো প্রতি আমার চিত্ত দূর্বলতা পর্যন্ত জাগেনি। কোনো না কোনো ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাদের মধ্যে কোই না কোই স্বোয়ার্থ মুঝে নজর আতা থা ! ফির এক দিন ...... ! 
     ফের নিস্তব্ধতা, ফের অনুরোধ, ফের প্রতীক্ষা। 
     - এক দিন এক পার্টি মেঁ গায়া। হলের মধ্যে ঘোরাফেরা করছি। হঠাৎ আমার মনে হলো ইতনা দিন সে আমি যে পরীর সন্ধান করছিলাম, সে যেন পাখাগুলো ছাদের উপর রেখে এখানে এসে ঘুরঘুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যেন আর আমাতে নেই, একেবারে উন্মনা উন্মাদ হয়ে উঠেছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গ ছেড়ে পানীয়ের বাহানায় ফুলপরীর আগেপিছে করছিলাম। ভাবছিলাম পরীরা বুঝি এতো নির্মম হয়? একবার ও যে মোড়কর নেহিঁ দিখতি! নিজের অজান্তেই কখন একেবারে তার কাছে পৌঁছে গেছি। বুঝতেই পারিনি যে তার লটকানো সুদীর্ঘ 'পাল্লু'তে আমার পা পড়ে গেছে। ...... আপলোগ কভী নাগিন দেখা হ্যায় ‍? ম্যায়নে দেখা ! 
     আবারও সেই নীরবতা! এবার একেবারে জানলার দিকে মুখ করে শর্মাজী আকাশে উড়ন্ত পাখির দলটির প্রতি ধ্যানস্থ হয়ে পড়লেন! 
     নেতা বাবুকে আবার ও এক্টিভ হতে হলো। 
     -তো ফির ক্যা হুয়া থা শর্মাজী? 
     খানিকক্ষণ পর শর্মাজী মুখ ফেরালেন। সবাই মনে মনে কামনা করছেন- এবার মুখ খুলুন শর্মাজী।
     -নাগিন পিছে মোড়তে মোড়তে শেরনী কি তরাহ দাহাড়তে হুয়ে বোলি- হাও হেল য়্যু, অন্ধে হো ক্যা ? আঁখে... ! 
     ফির আমার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো! আমার বুকে কম্পন ধরার উপক্রম ! একেবারে কাঁচুমাচু হয়ে হস্তযুগল জোড় করে- মাফ কিজিয়েগা, আনজানে মেঁ.... যখন বলছি, দেখি ওর মেজাজ পুরো পাল্টে যাচ্ছে! আমার চেহারার ভূগোল, জ্যামিতি, আর্কিওলজিক্যাল ফেক্টস যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে! 
     এবার সত্যি সত্যি পরীর মতো সুরেলা সুমিষ্ট সুরে বলে উঠলো- সরি, ম্যাঁয়নে সমঝা মেরে পতি হ্যায় !  

      -ভাইজান, উসদিন সে মেরী তওবা, মেরা পিতাজী কি তওবা, মেরা দাদাজী কা তওবা- শাদি করনে কা সারে হোসলা মেরা উসীদিন টুঠ গয়া ! ফির কভী হিম্মত না জুটা পায়া! আজ তক মেরা রুহ কাঁপ উঠতা উসদিন কা ইন্সিডেন্ট ইয়াদ হোতে হুয়ে- বলে দুখানা হাত বুকের উপর চেপে ধরলেন! 
                                      ১৯-০৭-২০২০

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।