সর্দারজি কে সাথ 
°°°°°°°°°°°°°°°°°
       একবার এক পাঞ্জাবি ফ্যামিলির সাথে আমার সফর হয়েছিল। সে প্রায় প্রাচীনকালে। অর্থাৎ আমি যখন উনিশ কুড়ির-ছোকরা। জানিনা তখন পর্যন্ত চেহারায় 'ইছারাঙা' ভাবখানা রয়ে গিয়েছিল কি না। তবে সেটা ছিল আমার প্রথম 'বিদেশ' যাত্রা। ওহ, ভাবছেন হয়তো এতো কম বয়সেও বুঝি প্রাচীন কালের আশেপাশের মানুষ পাসপোর্ট তৈরি করা ফেলতো? না না, সেরকম কিছু নয়। আসলে তখন পর্যন্ত আসামের বাইরের জগতটা ছিল আমার কাছে বিদেশ ই। এবং সেই অর্থে সেটি ছিল কোনো 'বিদেশি'র সঙ্গে আমার প্রথম সহযাত্রা। 
      ট্রেনে উঠে নিজের সিটখানা খুঁজে পেলাম যখন, তখন তা টোটেলি এনক্রোজড। ইয়া মোটা পাগড়ি ওয়ালা সর্দারজি সপত্নিক সমাসীন আমার জন্য নির্ধারিত আসনে। এক গাদা লটবহর এদিক ওদিক ছড়িয়ে। টিকিট হাতে নিয়ে সিটের দিকে ইশারা করতেই সর্দারজি বলে উঠলেন- ও ইয়াং ম্যান, আইয়ে আইয়ে, বৈঠ যাইয়ে ইধার। বসার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। নাম জিজ্ঞেস করলেন। তারপরের প্রশ্ন- হিন্দি আতা হ্যায়? একপ্রকার থতমত খেয়ে মনে মনে ভাবলাম-বলছেন কি উনি, হিন্দি আবার জানবো না! ক্লাস সেভেন পর্যন্ত হিন্দির যত বিখ্যাত শাস্ত্রসমুহ ছিল, তার তাবৎ অধ্যয়ন করেছি- সর্বান্তকরণে। এমনকি रमेश की दूकान পর্যন্ত। হ্যাঁ, রমেশের দোকান নিয়ে হিন্দি সাহিত্যের এক বিরাট ত্রুটি সংশোধনের যৎপরনাস্তি প্রচেষ্টাও সেদিন করেছিলাম, যদিও শিক্ষক মহাশয় উল্টো আমাকেই ভুল প্রতিপন্ন করে ছেড়েছিলেন। বিষয়টি হলো আমাদের ক্লাসেও এক রমেশ ছিল, যাকে আমরা পুরো এক নর বলে জানতাম, সে কখনও এক নারী হতে পারে বলে ভাবিনি। তাই তার মতো আরেক রমেশ 'কী' দোকান হতে যাবে কেন? রমেশ 'কা' দুকান হলোনা কেন? বইয়ের মধ্যে এতোবড় গলদটা কিভাবে ছাপা হয়ে এলো, তা ই ছিল আমার সংশোধনী প্রস্তাব। এই বিষয়ের উপর আমাদের শিক্ষক মহাশয় সেদিন এক বিরাট লেকচার দিয়ে অবশেষে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন- যেহেতু 'দুকান' একজন আস্ত নারী, তাই 'रमेश की दूकान' শাস্ত্র বিচার অনুসারে পুরোপুরি বিশুদ্ধ। এবং সেদিন থেকে হিন্দির এতোটুকু পর্যন্ত জানি যে দোকান সর্বদাই একজন মহিলা! অতঃপরও সর্দারজি জিজ্ঞেস করছেন আমি হিন্দি জানি কি না! দম্ভভরে তাই মাথা এবং মুখ উভয় প্রত্যঙ্গ দিয়ে জানিয়ে দিলাম যে হ্যাঁ, হিন্দি খুব ভালো জানি! সর্দারজি পরিচয় করিয়ে দিলেন বিবি সাহেবার সহিত। -ইয়েহ হ্যায় হরপ্রীত কৌর, মেরী ধরমপত্নী। লম্বি সফর, মিলঝুল, বাতচিত করতে হুয়ে চলে জায়েঙ্গে। আমার খটকা হলো- ব্রিফকেসে লেখা করতার সিং, জলন্ধর, পত্নী হরপ্রীত কৌর! জানতাম মুসলমান মিয়া বিবি নিজেদের টাইটেল, ভিন্ন হলেও তা ব্যবহার করে থাকেন, আর অন্যান্যদের গোত্র মার্জ হয়ে এক টাইটেল হয়ে যায়। অবশ্য আজকাল মুসলমান মিয়া বিবিরাও এফিডেভিট করে পাল্টাপাল্টি শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু এখানে দেখছি বিষয়টি অন্য রকম। জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। সর্দারজি বললেন- শিখদের সকল মহিলাই 'কৌর', তা যে কোনো খান্দানের বেটি বা পত্নী হলেও। 
      বোঁচকা থেকে ফ্লাক্স খুলে চা বের করলেন মিসেস কৌর। প্লাস্টিকের অনেকগুলো কাপ সঙ্গে। অবশ্য আজকালকার এই হালকা কাগুজে কাপ নয়। কড়াওয়ালা হাল্কা প্লাস্টিকের। আমাকেও দিলেন এক কাপ। চা খেয়ে কাপ ধুতে যাচ্ছি বেসিনে। বাধা দিলেন মিসেস কৌর। বললেন কাপটি বাইরে ফেলে দিতে। সর্দারজি ফোড়ন কাটলেন- ইনি একজন এক্স-নার্স। তাই হেল্থ কেয়ার নিয়ে খুব হুঁশিয়ার। 
      কথাটি শুনে কেমন বেখাপ্পা লাগছিল, বয়স তো তেমন নয়, তাহলে 'এক্স' কেন? 
      - এক্স-নার্স, মতলব? 
      - মতলব একসময় নার্সিং সার্ভিস করতেন। কিন্তু বড়শি মেঁ মুঝকো ফাঁসাকর ছোড় দিয়া। 
      ভ্যাবাচ্যাকার মতো চেয়ে রইলাম। সর্দারজি যেন টপিক পেয়ে গেলেন গল্প জুড়ে দেবার। 
      -বাত এ্যসা হ্যায়। মেরা বাউজি একবার খুব 'বিমার' হলেন। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। একটি কেবিন নিয়েছিলেন। আমি তখন লেখাপড়া শেষ করে পুরো বাউণ্ডুলে। ঘর মেঁ খানা ,বাহর পিনা, ইয়ার দোস্ত কে সাথ মউজ-মস্তি করনা- সেই ছিল রুটিন। অব বাউজি বিমার হুআ, হাসপাতালে খবর নিতে যেতেই হলো। গিয়ে দেখি ইতনি খুবসুরত এক নার্স পিতাজির সেবায় নিয়োজিত। সুযোগ মতো জিজ্ঞেস করলাম- আপনার ডিউটি কখন কখন হয়? নার্স ছোকরি নে বোলি- যতদিন বাউজি হাসপাতাল মেঁ রহেঙ্গে, উতনা দিন কে লিয়ে উনকি ডিউটি য়ঁহা মেঁ দিয়া গায়া! পরদিন থেকে আমার পিতৃভক্তি দারুন বেড়ে গেলো। রোজ বাবার সেবাযত্ন করতে হাসপাতালে, দিনভর পড়ে থাকতাম। এক বাত কহুঁ, ওয়াহি গুরু মাফ করে, সেইদিন গুলোতে রোজ প্রার্থনা করতাম 'বাউজি'র বিমারী লম্বী হোতে যায়ে! কিতনা বড়া পাপ কিয়া ম্যায়নে! ঔর ইস পাপ কী সাজা জিন্দেগি ভর ভুগত রহা হুঁ! 
      মিসেস কৌর কনুই দিয়ে এক গোতা দিলেন সর্দারজিকে। দেখলাম বেশতো রসিক মানুষ এরা। তারপর সর্দারজি বললেন- এই নার্সের পাল্লায় পড়ে উনার জীবনটাই বিমারী জ্যায়সা হো গয়া।হর ওক্ত ইয়ে মত খাও,ওহ মত পিও! বাপরে! আচ্ছা বোলিয়ে তো, পিনা নেহি, তো জিনা ক্যায়সা!
      ধীরে ধীরে তাদের কথাবার্তায় মনে হলো আনকোরা যাত্রা হলেও জার্নি মন্দ হবেনা- এমন হাস্যরসিক সহযাত্রীদের সঙ্গে। আসলে পাঞ্জাবিদের সম্বন্ধে জানা তো দূরের কথা, এর আগে পর্যন্ত কোনো অবাঙালির সাথে মেলামেশা, চলাফেরা করার সুযোগই হয়নি কোনোও দিন। 
      বাস্তবে পাঞ্জাবি সর্দারজিরা যে সত্যিই রসিক মেজাজের হয়, বরং বলা ভালো, এদেশে হাস্যরস আর কৌতুকের পরম্পরা সর্দারজিরাই ধরে রেখেছেন, তা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম আরও পরে।
      কিছু বড় হয়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখালেখি যখন পড়ার সুযোগ হল, অবগত হয়েছি যে ঢাকা শহরে এক সময় এক্কাগাড়ি বলে একপ্রকার ঘোড়ার গাড়ি যারা চালাতো, তাদের পরিচিতি ছিল 'কুট্টি' বলে। এই কুট্টিরা ছিল খুব রসিক প্রকৃতির মানুষ। কাউকে গালি দেবার হলেও কুট্টিরা এমন হাস্যরসের মাধ্যমে তা পরিবেশন করতো যে লোকজন তাদের বকুনিও উপভোগ করতো। এরকম একটি উদাহরণ কোথাও তিনি দিয়েছেন- এক যাত্রী কুট্টির গাড়িতে সওয়ার হয়ে যাত্রা করছেন‌। ভাড়া দেওয়ার সময় খুব দরাদরি শুরু করে দিলেন। অর্ধেক ভাড়াও দিতে চাইছেন না। কুট্টী মাথা নামিয়ে নিচু স্বরে বললো- আস্তে কইয়েন হুজুর, এই ভাড়াটা হুনলে আমার ঘোড়াটা ও হাইসবো! 
      সে যাই হোক, আমার প্রথম 'বিদেশ' যাত্রার সময়ই এমন সুরসিক মানুষগুলোকে সহযাত্রী হিসেবে পেয়ে প্রথম একাকী যাত্রায় যেন আর তেমন একাকী মনে হচ্ছিল না। 
      রাত হয়ে এসেছিল। 'খানা'র অর্ডার নিতে এসেছে পেন্ট্রিকারের একটি ছেলে। জানতে যাচ্ছিলাম কি কি খাবার হবে। সর্দারজি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন রুটি খেতে পারবো? বললাম চলবে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটিকে বলে দিলেন- ইয়েহ 'লোণ্ডা' হামারে সাথী হ্যায়, একসাথ খা লেঙ্গে। 
      আমার মাথায় বাজতে লাগলো 'লোণ্ডা'! লণ্ডি তো শুনেছি, গ্রামদেশে আমরা 'লণ্ড্রি'কে দিব্যি লণ্ডি বলে থাকি, কিন্তু এই লোণ্ডা বস্তুটি আদতে কোন জিনিস? কথাটি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই খাবার বের করতে লাগলেন মিসেস কৌর। রুটি,তরকা,ডাল, চাটনি-অনেক গুলো আইটেম। দুখানা রুটিও পুরো খাওয়া সম্ভব হলোনা আমার। হ্যাঁ, খেয়েদেয়ে খাবার তারিফ করতে ভুল করিনি। তারিফ শুনে সর্দারজি বললেন- ইসকা শ্রেয়হ ইনকী হ্যায়। ফের বললাম- ভাবিজী বহুত আচ্ছা খানা বানাতি হ্যায়। থ্যাঙ্ক ইউ ভাবিজী। 
      -আরে ইনকো ক্যাউ থ্যাঙ্কু বোল রহা হ্যায়, খানাতো ম্যায়নে বানায়া। 
      আমি তো ফের বেকুব! 'শ্রেয়' একজনের, আবার বানিয়েছেন অপরজন। রীতিমত গোলকধাঁধা। জানতে চাইলাম রহস্যটা কি? 
      -'আসল মেঁ বাউজি বিমার' হয়ে হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হবার দিনই ইনকী নর্মাল ডিউটি ছিল। বাউজির মাথায় প্যাচ খেললো। তিনি জানতেন তাঁর বাউণ্ডুলে ছেলে একবার হলেও বাবাকে দেখতে যাবে। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ওই নার্সকে রেগুলার নিযুক্ত করিয়ে নিলেন। ফলাফল হাতেনাতে। পর মাননা পড়েগা, বাউজির প্ল্যানের সামনে মাড়োয়ারি ভী মার খায়গা! আমার ঔৎসুক্য দেখে মা'কে বললে- আগর ইস লাড়কি কো শাদি করনা হ্যায়, তো আপনা সে করনে দো। হম ইসমে নেহি হ্যায়। ইয়েস-নো দোনু বোল দিয়া একসাথ মেঁ। শাদী তো হয়ে গেলো, এবার বাউজি বেঁকে বসলেন যেহেতু সামাজিকভাবে বিয়ে হয়নি, তাই তিনি এই 'বহুঁ'কে ঘরে তুলবেন না! মহা মুশকিল! হরপ্রীত এবার কোয়ার্টার নিয়ে নিলো। অব ম্যাঁয় ফাঁস গয়া। কুছ কামধাদ্ধা নেহি, ফির শাদীশুদা! ইয়ার দোস্তরাও আর পাত্তা দেয়না। এদিকে হরপ্রীত কো খানা বানানা নেহি আতা, ফির টাইমপে ডিউটি জানা পড়তা। ঘরে বসে যেহেতু কোনো কাজ নেই, তাই খানা বানাতে চেষ্টা করতে লাগলাম। ধীরে ধীরে আচ্ছা শেফ হয়ে উঠলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটি খটকা, একটি লজ্জা, কতদিন এভাবে ঘরে বসে বসে বিবির উপার্জনে খেয়ে বাঁচবো। 
      পরের শীতে আমার এক বন্ধু যোগিন্দর বাড়ি গেছে। তার সাথে দেখা হলো। বছর তিনেক আগে সে গৌহাটি এসেছিল। এখানে ব্যবসা খুলে ভালো প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। হোটেল ব্যবসা। বললাম ভাই, আমার জন্য কিছু একটা কর, আমাকে এবার নিজের পায়ে খাড়া হতেই হবে। যোগিন্দর বললো আরোও একটি দোকান সে পেয়েছিল, সেখানেও হোটেল ব্যবসা ভালো চলবে। কিন্তু পুঁজি দিয়ে সে সামলাতে পারবে না বলে কথাবার্তা ফাইনাল করেনি। চাইলে তার সঙ্গে গিয়ে দেখে আসতে পারি। কিন্তু হোটেল ব্যবসার একটি সমস্যা, ভালো কারিগর পাওয়া ভীষন মুশকিল। তাকে বললাম, ভাই কারিগরের জন্য কোনো সমস্যা হবেনা, আমি নিজেই আজকাল ভালো এক কারিগর। সম্পুর্ণ কাহিনী বললাম তাকে। 
      এবার চিন্তা হলো, পুঁজির যোগাড় কি করে হবে। মায়ের কাছে গিয়ে সবকিছু বললাম। পরদিন মা খবর দিলেন বাড়ি যাবার জন্য। সেদিন বাউজিও বাড়িতে। আমাকে ডেকে নিয়ে যা বললেন, শুনে আমি একেবারে থ বনে গেলাম! বললেন উনি চাইছিলেন কাজকর্ম কিছু করে সংসারের দায়িত্ব উপলব্ধি করতে। কিন্তু আমার কুসঙ্গ তাঁকে বেদনা গ্রস্থ করে তুলেছিল। তাই শেষ পর্যন্ত হরপ্রীতের সঙ্গে মিশতে দেওয়া, বিয়েতে মানা না করা, বহুঁকো ঘর মে লেনেকো মানা করা- সবকিছু ছিল এই দিনটি দেখার জন্য। যাও, যোগিন্দরের সাথে, সবকিছু ঠিকঠাক হলে এসো, আমিও সঙ্গে গিয়ে দেখে আসবো। পুঁজি পত্তরের অসুবিধা হবেনা। 
      আজ দশ সাল হুয়া, পল্টন বাজার মেঁ মেরা হোটেল বিজনেস হ্যায়। কিছু দিন আগে মাই-বাউজি এসেছিলেন, বাচ্চা দুটোর সামার ভ্যাকেশন হওয়ায় নিয়ে গেছেন। ঘরে যাচ্ছি, দেখভাল করে বাচ্চাদের নিয়ে আসবো। 
                                    -শেষ নয় ।
                                    ২০-০৭-২০২০

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।