ডর কে আগে জিত হ্যায়।
'ডর কে আগে জিত হোতি হ্যায়' !
আজকের, এই অত্যাধুনিক যুগে এরকম একটি কথা প্রচলিত রয়েছে যে ভয় পোয়ো না, ভয়ের ওপারে বিজয় নিহিত রয়েছে। কিন্তু আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ শত বছর আগের, যদি আমরা মহানবী(সাঃ)- এর জীবনাদর্শ পর্যালোচনা করি, দেখতে পাবো এমন অনেক দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন। তাঁর সঙ্গী সাহাবা দেখতে পেয়েছিলেন আপাত-শঙ্কাজনক সেই কঠিন পরিস্থিতি সমুহে তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন ধৈর্য অবলম্বন করার- যা সুকঠিন ছিল বটে, কিন্তু পরিণাম ছিল শুভ। পরিণতি ছিল বিজয়। তাঁর এই শিক্ষা চিরন্তন, চিরকালের জন্য। আজকের দিনেও মুসলমান-ওমুসলমান নির্বিশেষে যে কেউ এই মহান আদর্শের প্রতি আস্থা রেখে চলবে, নিশ্চিত শুভ পরিণাম হবে তার বা তাদের প্রাপ্য।
প্রাসঙ্গিক বিষয়ে একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে চাইছি আজ- মহানবী(সাঃ)- এর জীবনাদর্শ থেকে। ঘটনাটি হচ্ছে হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং তার পরিণাম।
আমরা জানি যে বিশ্বনবী হযরত মুহা'ম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর মহান সাহাবাগণের জীবনে এমন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষামূলক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা গোটা মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্ত ও উত্তম আদর্শ হিসেবে প্রতীয়মান। বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর প্রতিজন সদস্যের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক জীবন পরিক্রমায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ, সিদ্ধান্ত, অন্যের কাজে সমর্থন, নির্দেশনা এবং যুদ্ধ, শান্তি, আক্রমণ বা প্রতিরক্ষানীতি- সবই উৎকৃষ্ট নমুনা ও মৌলিক ভিত্তি।
ঐতিহাসিক ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ বা হুদাইবিয়ার শান্তিচুক্তি মুসলিম উম্মাহর জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এটি ছিল মহানবী(সাঃ) -এর নেতৃত্বে মুসলমানদের দাওয়াতি কার্যক্রমের পথপরিক্রমায় এক সুস্পষ্ট টার্নিং পয়েন্ট। এই সন্ধির ঘটনা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের পথ সুগম এবং ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছিল। হুদায়বিয়ার ঘটনার মধ্যে রয়েছে আল্লাহতাআ'লার পথে লড়াই, রাজনৈতিক কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংক্রান্ত ইসলামী বিধি বিধানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক নীতি গ্রহণের মূলমন্ত্র বা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুসলিম দেশ, জাতি, ভূখণ্ড বা উম্মাহর শান্তি, স্থিতিশীলতা, কল্যাণ কিংবা স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কখনও শত্রু বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে শান্তি বা সমঝোতা চুক্তি সম্পাদনের জন্য হুদাইবিয়ার সন্ধি একটি শক্তিশালী প্রামাণিক দলিল। মুসলিম জাতিকে এই সন্ধি শিক্ষা দিয়েছে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মৌলিকনীতি এবং শান্তিপূর্ণ, ইতিবাচক বা ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্মকৌশল।
হুদাইবিয়া শান্তিচুক্তির কোন কোন ধারা-উপধারাকে কিছু মুসলমান অগ্রহণযোগ্য বা অনাকাঙ্ক্ষিত নমনীয়তা তথা পরাজয় বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু মহানবী সায়্যীদুল মুসলিমীন রাহ'মাতুল্লিল আ'লামীন তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে এর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই মুসলমানদের জন্য সম্মান, মর্যাদা ও সফলতার সোপান এবং সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক বিজয়।
হুদায়বিয়া মক্কা শহর থেকে মাদীনা যাওয়ার পথে, হারামের সীমানার সন্নিকটে মসজিদুল হারাম থেকে নয় মাইল দূরে অবস্থিত একটি স্থানের নাম। এখানে ‘হুদায়বিয়া’ নামে একটি কূপ ছিল। যে কারণে এলাকাটি হুদায়বিয়া নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঘটনাটি এই স্থানেই ঘটেছিল। বর্তমানে এই স্থানটিকে শামীসাও বলা হয়। (সীরাতে ইবন কাসীর-বঙ্গানুবাদ, পৃ-৯০)।
সন্ধির ঘটনা
ষষ্ঠ হিজরী সনের জিলকদ মাসে রাসূলুল্লাহ(সাঃ) পবিত্র উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে এক হাজারের অধিক সাহাবী নিয়ে মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মক্কা মুকাররমায় রওয়ানা দেন। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে মুসলমানগণ এই কাফেলায় যোগ দিতে থাকেন। ফলে সাহাবীর সংখ্যা চৌদ্দশত হয়ে যায়। কাফেলা যখন গাদীরে আশতাত পৌঁছলো, গুপ্তচর এসে নবীজীকে সংবাদ দিলেন যে, তাঁর আগমন সংবাদ পাওয়া মাত্রই কুরাইশরা মক্কার উপকণ্ঠে সেনা সমাবেশ করেছে। তাঁর মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং শপথ করেছে যে, মুসলিমদের মক্কায় প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।
অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে দুশো অশ্বরোহী বাহিনী গানীম নামক স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছে। এই রূঢ় সংবাদ পাওয়ার পরই রাসূলুল্লাহ(সাঃ) পথ পরিবর্তন করে গিরি পথে হুদায়বিয়ায় উপস্থিত হন।
কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল বিন আমর সন্ধি করার জন্য মুসলিম ক্যাম্পে এসে উপস্থিত হলো। রাসূলে আকরাম(সাঃ) সুহাইলকে আসতে দেখে সাহাবাগণকে বললেন, ‘তোমাদের কাজ কিছুটা সহজ হয়ে গেলো’। কওমটি সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এই লোককে তারা সন্ধির জন্য প্রেরণ করেছে।
দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হলো। সন্ধির শর্তাবলী সম্পর্কে নবী করীম(সাঃ) এবং সুহাইল ঐকমত্যে পৌঁছালেন। সন্ধির শর্তাবলী ছিল নিম্নরূপঃ
১। দশ বছর পর্যন্ত সকল যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ থাকবে, মানুষ পরস্পর নিরাপত্তা অনুভব করবে। এর মধ্যবর্তী সময়ে কেউ কারও প্রতি তরবারি উঠাবে না এবং কেউ কারও প্রতি অবিশ্বস্ত হবে না।
২। মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যক্তি মাদীনা থেকে মক্কায় আসবে, তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে না। তবে কুরাইশের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি যদি তার অভিভাবক ও পরিবারের অনুমতি ছাড়া মদীনায় আসে, তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, যদিও সে মুসলমান হয়।
৩। অন্যান্য গোত্রের কেউ যদি মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সঙ্গে কোন চুক্তিতে স্বেচ্ছায় আবদ্ধ হতে চায়, আবদ্ধ হতে পারবে। এমনিভাবে কেউ যদি কুরাইশদের এর সঙ্গে কোন চুক্তিতে স্বেচ্ছায় আবদ্ধ হতে চায় আবদ্ধ হতে পারবে।
৪। মুহাম্মাদ(সাঃ) সকল সঙ্গীদের নিয়ে এ বছর উমরাহ না করেই মদিনায় ফিরে যাবেন। মক্কায় প্রবেশ করবেন না। আগামী বছর কেবল তিনদিন মক্কায় অবস্থান করে উমরাহ সম্পন্ন করে ফিরে যাবেন। ঐ সময় তাঁরা আরোহীর তরবারি ছাড়া আর কোন অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে পারবেন না এবং তরবারি থাকবে কোষবদ্ধ।
৫। দুইদলের মধ্যে ইতিপূর্বে যুদ্ধ সংঘটনের জন্য যা কিছু হয়েছে, সেসব বিষয়ে আর কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। উভয় পক্ষ সন্ধি চুক্তি রক্ষায় সর্বাত্মক সচেষ্ট থাকবে এবং অস্থিরতা বা দ্বন্দ্ব সহিংসতা সৃষ্টির মতো কোন ঘটনা যেন না সংঘটিত হয়, সে দিকে জোর দেবে। (সীরাতে মুস্তাফা, খন্ড নম্বরঃ ২। পৃষ্টা-৩০৭-৩১০)।
চুক্তির শর্তাবলী তৈরি। এবার উভয়পক্ষের স্বাক্ষর হবে। কিন্তু এভাবে মুসলমানদের জন্য সবকটি অপমানকর শর্ত ! নাবীজী কি মেনে নেবেন ? হযরত উমারের মতো অগ্নিশর্মা সাহাবী বেঁকে বসলেন। একসময় নাবীজীর প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের সামনে সকলেই নিশ্চুপ। অবশেষে স্বাক্ষরিত হলো সেই ঐতিহাসিক দলিল- হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি।
হুদায়বিয়া শান্তিচুক্তির শুভপরিণাম।
আপাত দৃষ্টিতে চুক্তির সমুহ শর্তাবলী মুসলমানদের জন্য অপমানকর মনে হয়েছিল যদিও, নাবীপাক সাঃ এর দূরদৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল এর আশু এবং অবশ্যম্ভাবী শুভ পরিণামের প্রতি। দেখা যাক কিভাবে, কি কি শুভ পরিণাম মুসলমানদের জন্য নিয়ে এসেছিল হুদাইবিয়ার সন্ধি।
১। প্রথমত এই চুক্তির মধ্য দিয়ে মুসলমানদের স্বার্থ ও কল্যাণ লাভের আশায় প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রুপক্ষের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করার বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। হুদায়বিয়ার সন্ধি মুসলমানদের জন্য অনেক কল্যাণ ও সফলতা বয়ে এনেছিল- যা যুদ্ধের দ্বারা সম্ভব হয়ে উঠতো না। সেই কল্যাণগুলো হলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে নিষ্কৃতি, নিরাপত্তা ও শান্তি অর্জন- আর এটিই ইসলামের প্রকৃত দাবি বা প্রয়োজন। এই বিষয়ে আল-ক্বুরআন এবং সুন্নাহের নববীতে অনেক দলিল রয়েছে।
২। সংখ্যা কম হোক অথবা বেশি, সন্ধির মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়কে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দান করা হয়েছিল।
৩। তৃতীয় এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইসলামী কর্মকাণ্ড নির্বিঘে করার জন্য সকল শত্রুকে অন্যদিকে মনোযোগী করা সম্ভব হয়। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হলো- ইসলামী দাওয়াতের বিস্তার, মুসলিম শাসন সুদৃঢ় করা, ন্যায় বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, রক্তপাত বন্ধ করা এবং সকল মানুষের অধিকার, সম্মান ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৪। সন্ধি ও শান্তি স্থাপনের কারণে পথঘাট নিরাপদ হয়ে যায় এবং ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সকল বাধা অপসারিত হয়। আরব গোত্রসমূহের বিভিন্ন প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পায়। রাসূলুল্লাহ(সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম আরবের কোণে কোণে ইসলামের দাওয়াতনামা প্রেরণ করতে সক্ষম হন। তাদের মধ্যে কয়েকজন বড় বড় সম্রাট ও বাদশাহ ইসলাম গ্রহণ করেন। এসব কার্যক্রমের ফল এই দাঁড়ায় যে, হুদায়বিয়ার ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ব্যাপক দাওয়াত ও ওমরার জন্য বের হওয়ার তাকিদ সত্ত্বেও যেখানে দেড় হাজারের ও কম মুসলমান সঙ্গে ছিলেন, সেখানে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। এই সময়েই সপ্তম হিজরিতে খায়বার বিজিত হয়। যার ফলে বিপুল পরিমাণে সমর উপকরণ মুসলমানদের হস্তগত হয় এবং মুসলমানদের সমরশক্তি সুসংহত হয়। সন্ধির পর দুই বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মুসলমানদের সংখ্যা এত বেড়ে যায়, যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে। এরই ফলস্বরূপ কুরাইশদের পক্ষ থেকে চুক্তিভঙ্গের দরুন যখন রসূলুল্লাহ(সাঃ) গোপনে মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি শুরু করেন, তখন সন্ধির মাত্র বিশ একুশ মাস পর, তাঁর সঙ্গে মক্কাগমনকারী আত্মনিবেদিত মুসলমান সিপাহীদের সংখ্যা ছিল দশ হাজার। সংবাদ পেয়ে কুরাইশরা উদ্বিগ্ন হয়ে চুক্তি নবায়নের জন্য তড়িঘড়ি করে তাদের নেতা আবু সুফিয়ানকে মাদিনায় প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চুক্তি নবায়ন করলেন না। অবশেষে দশ হাজারেরও অধিক লশকর সঙ্গে নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। কুরাইশরা এতো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, মক্কায় তেমন কোন যুদ্ধের প্রয়োজনই হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দূরদর্শী রাজনীতিও কিছুটা যুদ্ধ না হওয়ার পক্ষে সহায়তা করেছিল। তিনি মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করে দেন যে, যে ব্যক্তি গৃহের দরজা বন্ধ করে রাখবে, সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি মাসজিদে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ এবং যে ব্যক্তি কুরাইশ সর্দার আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ। এভাবে সব মানুষ নিজ নিজ চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং যুদ্ধের তেমন প্রয়োজনই দেখা দেয়নি। এই কারণেই অতি সহজে রক্তপাতহীন অভিযানে রাসূলে আকরাম(সাঃ) -এর জন্মভূমি ঐতিহাসিক মক্কা বিজিত হয়ে যায়।
সাধারণ মানুষের চিন্তা ও অন্তর্দৃষ্টি আল্লাহ ও রাসূলের(সাঃ) মধ্যকার এই মীমাংসিত সত্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। তারা স্বপ্নের দ্রুত বাস্তবায়ন কামনা করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআ'লা বান্দাহদের দ্রুততা দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে দ্রুততা অবলম্বন করেন না। বরং তাঁর প্রত্যেক কাজ যথা সময়েই সুসম্পন্ন হয়ে থাকে।
ইমাম হযরত ইবনুল কাইয়্যিম(রাহঃ) বলেন, হুদাইবিয়া সন্ধির মাধ্যমে এই নমনীয়তা প্রকৃতপক্ষে এক প্রকারের বিজয়। কেননা, এর ফলে মানুষ পরস্পর নিরাপত্তা অনুভব করেছে। মুসলমানগণ অমুসলিমদের সঙ্গে সমাজে মিশে যেতে পেরেছিল। তাদেরকে ইসলামের সুমহান দাওয়াত দিতে পেরেছে। পবিত্র ক্বুরআন শুনিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে ইসলামের বিষয়ে নিরাপদে প্রকাশ্যে বিতর্ক করার পরিবেশ পেয়েছে। যারা ইসলাম গ্রহণ গোপন করে রেখেছিল, তারা প্রকাশ্যে আসতে পেরেছে। আর এই শান্তি চুক্তির মেয়াদের মধ্যেই স্বাধীনভাবে যার ইচ্ছা সে ইসলামে প্রবেশ করেছে। (যাদুল মাআ'দ। খন্ড-৩। পৃষ্টা-৩০০-৩০৯)।
আজ মহানাবী(সাঃ) আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু রয়েছে তাঁর আদর্শ, তাঁর শিক্ষা এবং সর্বোপরি আমাদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি সুগভীর প্রেম ও ভালোবাসা। এই নাবীপ্রেমের জন্য আমরা সইতে পারি না তাঁর প্রতি কোনো প্রকার কটুক্তি আর অপমান। যে কথা আজ নতুন করে বলার কিছু নেই। সারা বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে, চিত্ত-চেতনায় একটিমাত্র অপমানকর টিপ্পনির জন্য জ্বলে উঠেছে সুগভীর নাবীপ্রেম। দিকদিগন্তে আজ একই রব- অপমানকারীদের বিচার চাই, বিচার চাই !
হ্যাঁ, বিচার আমরা চাইছি, চাইবো। আমরা জানি বিচার চাইতে হয় কোথায় ? আদালতে। সে জন-আদালত, গণ-আদালত, সরকার আদালত অথবা জুডিশিয়াল আদালতে হোক। কিন্তু এই আদালত সমুহ যদি বধির হয়ে যায়, শুনেও শুনতে চায় না আমাদের নিবেদন, তাহলে আমাদের করণীয় কী ? সবর ! আপাত হেরে গিয়ে ধৈর্যধারণ করা।
গণতান্ত্রিক সিস্টেমে আমরা জানি আদালতে উপর আদালত হয়। তার উপর উচ্চ আদালত, তারও উপর রয়েছে সুপ্রিম আদালত। কিন্তু যে কথাটি খেয়াল রাখিনা, তা হচ্ছে এক আদালত রয়েছে সুপ্রিমের ও উপরে- সুপার সুপ্রিম আদালত। যেখানে বিচার হয়- কেবল ন্যায়বিচার। যে আদালতে জজ হচ্ছেন সুপ্রিম জজ। বিশ্বজনের পরম ভরসার নিশ্চিত ইনসাফ বিধানকারী।
জগতের আদালতের সকল রায় বিশুদ্ধ না ও হতে পারে, অনেক জাজমেন্ট অশুদ্ধ হয় ও। কিন্তু সেই সুপার সুপ্রিম আদালতে হয় কেবল ইনসাফ, পরম ন্যায়বিচার। তাই আসুন কিছু আপীল রেখে দিই সেই আদালতের কাছে। আসুন, আপাতত হেরে যাই, যেভাবে প্রত্যক্ষ হার মেনে নিয়েছিলেন আমাদের নাবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম- হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে। সবর করেছিলেন তিনি আর তাঁর সাহাবা। সেই সবরের বিনিময়ে হয়েছিল পরোক্ষভাবে বিজয় লাভ। যে বিজয়কে আল-ক্বুরআনের ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে ' 'ফাতহান কারীমা'!
-আ,ফ,ম, ইকবাল॥
২২-০৬-২০২২।
Comments
Post a Comment