প্রেমের পরিণতি পায় শুভ মিলনে। প্রসঙ্গ- লাইলি-মজনু।

প্রেমের পরিণতি পায় শুভ মিলনে।  প্রসঙ্গ- লাইলি-মজনু। 
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
     "স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অজস্র পথ আছে। আমি প্রেমকে বেছে নিলাম"।
           -মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি।  

      প্রেম আর ভালোবাসা কি একই জিনিষ ?  না, দুটোর বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা রয়েছে, রয়েছে স্বতন্ত্র রূপ।  ভালবাসার ক্ষেত্র আপাতদৃষ্টিতে  অনেক উদার ও সার্বজনীন। সেই তুলনায় প্রেমের ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রিত ও সংকীর্ণ। এই সংকীর্ণতার কিন্তু রয়েছে অনেক  ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি। ভালোবাসা হয় এক পক্ষ থেকে, আর প্রেম হয় উভয় পক্ষ থেকে।  ভালবাসার জন্য প্রেম আবশ্যক নয় কিন্তু প্রেমের জন্য ভালবাসা অপরিহার্য। প্রেম হয় দুইপক্ষ থেকে। আর ভালোবাসায় অপরপক্ষের সম্মতি মুখ্য নয়। প্রেম ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা স্বত্বানির্ভর। ভালোবাসা এমন কোন সিলেবাস মানেনা, ব্যক্তি-বস্তু, জীব-জড়-  সবকিছুই ভালোবাসার আওতায় পড়ে। প্রেম পরিণতি প্রাপ্ত হয় মিলনের মাধ্যমে। সেই মিলন সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে,  কেবল মানব-মানবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রকৃত প্রেম স্বার্থকতা প্রাপ্ত হয় সৃষ্টি আর শ্রষ্টার সন্তুষ্টি জনক মিলনের মাধ্যমে। 
      আমাদের প্রতিবেশে অনেক প্রচলিত প্রেমের গল্প রয়েছে। যেমন রোমিও-জুলিয়েট, লাইলি-মজনু, চণ্ডীদাস-রজকিনী, শিরী-ফরহাদ, রাধা-কৃষ্ণ ইত্যাদি। এসব প্রেম কাহিনীর কোনটি বিয়োগান্তক, আবার কোনোটি মিলনান্তক। 
      আজ আমার আলোচ্য কাহিনীটি লাইলি-মজনু। লাইলি আর মজনুর প্রেম কাহিনীর কথা শোনেননি এমন লোক উপমহাদেশে খুঁজে পাওয়া ভার। তবু হয়তো কারো কাছে পরিস্কার নয় কেমন ছিল তাদের প্রেমের কাহিনী। কীভাবে তাদের প্রেমের শুরু, কী তার পরিণতি- সে খুঁটিনাটিগুলো সম্পর্কে অনেকেরই হয়তো অবগতি নেই। শেক্সপিয়ারের রোমিও-জুলিয়েট বিশ্বে যতটা বিখ্যাত, উপমহাদেশে লাইলি-মজনু কিন্তু আসলে ততটাই নামকরা, হয়ত আরো বেশি। কিন্তু রোমিও-জুলিয়েট যত বেশি পঠিত বা চিত্রিত হয়েছে, আর মানুষের মনে গেঁথে গেছে কাহিনীটুকু, লাইলি-মজনুর ক্ষেত্রে আসলে ততটা হয়নি। যদিও বাজারে লাইলি-মজনুর প্রেম কাহিনী নিয়ে অনেকগুলো ভার্সন যেমন রয়েছে, তেমনি এদেশে ওদেশে নির্মিত হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র। মজার কথা- এই চিত্রগুলোর মধ্যে ঘটনা প্রবাহের রয়েছে বিস্তর এবং লক্ষণীয় ফারাক।    
      চলুন তাহলে আজ প্রথমে একবার জেনে নেয়া যাক লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী। একেবারে সংক্ষিপ্ত আকারে। 
      কিশোর কায়েস ইবনে আল-মুল্লাওয়াহ লায়লি আল-আমিরিয়ার প্রেমে পড়েছিল।  শীঘ্রই সে লাইলির প্রতি প্রেম সম্পর্কে কবিতা রচনা করতে শুরু করে দিলো। প্রায়শই তার নাম উল্লেখ থাকতো কবিতা গুলোতে। মেয়েটিকে আকৃষ্ট করার জন্য তার একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে  স্থানীয় কিছু লোক তাকে "মজনুন" বলে ডাকতে শুরু করেছিল। যার সংক্ষিপ্ত আকার মজনু।  
      মজনু যখন বিয়ের জন্য লায়লির হাত চেয়েছিল, লায়লির বাবা তা প্রত্যাখ্যান করেলেন। কারণ সুস্পষ্ট- মানসিক ভারসাম্যহীন কাউকে বিয়ে করা লায়লির জন্য  হবে কলঙ্কময় জীবনকে নিজহাতে পরিগ্রহ করা। পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্য, লায়লিকে জোরপূর্বক তায়েফের থাকিফ গোত্রের অন্য একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনী বণিকের সাথে বিয়ে দেয়া হলো। 
     মাজনু এই বিয়ের খবর শুনে স্বস্থান ত্যাগ করে কোথাও হারিয়ে যায়। অজ্ঞাত মরুভূমিতে পুরোপুরি মজনুন হয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে। তার পরিবার যদিও তার ফিরে আসার আশা ছেড়ে দেয়, কিন্তু বাসনা ত্যাগ করতে পারে না। একদিন নিশ্চয়ই ফিরে আসবে- এই প্রত্যাশায় তার জন্য প্রান্তরে নিয়মিত খাবার রেখে দিত।  
     প্রত্যন্ত মরুভূমিতে কেউ কেউ তাকে আনমনে কবিতা আবৃত্তি করতে বা বালিতে লাঠি দিয়ে লিখতে দেখতে পেতেন। অচেনা পাগলকে কেউ আর পাত্তা দিতোনা।
      এদিকে লায়লিকে নিয়ে তার স্বামী উত্তর আরবের একটি জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।  অবশেষে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়েন। কিছু সংস্করণে, লায়লীও তার প্রিয়তমকে দেখতে না পেয়ে ভগ্নহৃদয় মারা যায় বলে বলা হয়েছে। 
      কিন্তু  অধিকাংশ ভার্সনে এই প্রেমগাথাকে অমর করে তোলা হয়েছে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্ব তুলে ধরার মাধ্যমে। স্বামী মারা যাওয়ার পর কোনক্রমে লাইলী মজনুর কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু ততোক্ষনে মজনু আর এই নশ্বর জগতের কোনো মানবিয় প্রেমের আবেশের মধ্যে নেই ! নির্দিষ্ট স্থানে বসে বসে ঐকান্তিক সাধনার মাধ্যমে সে পেয়ে গেছে এক অনন্য এবং চিরন্তন প্রেমের স্বাদ ! প্রেমের সাধনায় পুরোপুরি ঘটে গেছে তার উত্তরণ। সেই পাগল মজনু আজ সাধক মজনু। চিরন্তন প্রেমের অবিনশ্বর প্রেমিকের সে সন্ধান পেয়ে গেছে। সুতরাং কোনো কায়াধারী প্রেমিকার আকুলি বিকুলি তার কাছে আর কোনোও মূল্য রাখে না ! 
      এই যে বিহ্বল পারিপার্শ্বিকতা, তার একটি নিখুঁত সুন্দর চিত্র চিত্রায়ন করেছেন আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম- একটি গানের মাধ্যমে। সেই কৈশোরে, বাংলাদেশ রেডিওতে শুনতাম গানটি- একাগ্রচিত্তে, আর গুনগুন করে গাইতাম ও! বিশেষ করে শবনম মুশতারি অথবা ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে।
      প্রাসঙ্গিকভাবে বলি, প্রেমের কবি নজরুল তাঁর অনেক কবিতা ও গানে পারম্পরিক প্রায় সকল প্রেমিক যুগলের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন শিরী-ফারহাদ, রাধা-কৃষ্ণ, লাইলী-মজনু ইত্যাদি। কিন্তু পরিপূর্ণ একটি সঙ্গীত রচনা করেছেন এই লাইলী- মজনু জুটিকে নিয়ে।   সেই গানটি হলো: 
      "লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া
       মজনু গো আঁখি খোলো।
       প্রিয়তম! এতদিনে বিরহের
       নিশি বুঝি ভোর হলো।। 
       
       মজনু! তোমার কাঁদন শুনিয়া
       মরু-নদী পর্বতে
      বন্দিনী আজ ভেঙেছে পিঞ্জর  
      বাহির হয়েছে পথে।
আজি দখিনা বাতাস বহে অনুকূল,
ফুটেছে গোলাপ নার্গিস ফুল,
       ওগো বুলবুল, ফুটন্ত সেই
       গুলবাগিচায় দোলো।। 
       
     বনের হরণ-হরিণী কাঁদিয়া  
     পথ দেখায়েছে মোরে,
     হুরী ও পরীরা ঝুরিয়া ঝুরিয়া  
     চাঁদের প্রদীপ ধ’রে
     পথ দেখায়েছে মোরে।
আমার নয়নে নয়ন রাখিয়া
কি বলিতে চাও, হে পরান-পিয়া!
      নাম ধরে তুমি ডাকো মোরে স্বামী
      ভোলো অভিমান ভোলো।।" 
                         -কাজী নজরুল ইসলাম।  

       বিরহীনি লাইলি জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমণ করে যখন দয়িতের নিকটবর্তী হবার সুযোগ পেলো, এসে দেখে মজনু ধ্যানে নিমজ্জিত। তার আগমনে, তার ডাকেও সাড়া দিচ্ছে না, তখন তার অন্তর থেকে উঠে এসেছিল ভগ্ন হৃদয়ের এই গানের কলি: 
       লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া
       মজনু গো আঁখি খোলো।
       প্রিয়তম! এতদিনে বিরহের
       নিশি বুঝি ভোর হলো !  

     নিঃসাড় মজনুর চৈতন্য জাগ্রত হচ্ছে না দেখে তাই লাইলী বর্ণনা করে তার করূন কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে মজনুর কাছে পৌছার সেই বেদনাময় গাঁথা- 
       মজনু তোমার কাঁদন শুনিয়া
       মরু-নদী পর্বতে
      বন্দিনী আজ ভেঙেছে পিঞ্জর  
      বাহির হয়েছে পথে।
আজি দখিনা বাতাস বহে অনুকূল,
ফুটেছে গোলাপ নার্গিস ফুল,
       ওগো বুলবুল, ফুটন্ত সেই
       গুলবাগিচায় দোলো।।   

      তবু মজনুর নেই কোনো হোলদোল ! এ কোন মজনু তাহলে- যার জন্য সে আজ বনবিহারিণী হরিণী ! এ কি তাহলে মজনুর অভিমান ? কিন্তু এখানে তো লাইলীর কোনো অপরাধ নেই। সে ছিল সত্যিই 'বন্দিনী' ! তবু কি তার মজনু তার প্রতি অভিমান করে নিঃস্তব্ধ নিঃসাড় হয়ে বসে রইবে ! এবার সে তাই বর্ণনা করেছে তার বেদনাবিধুর এই পথযাত্রার কথাঃ 
      বনের হরণ-হরিণী কাঁদিয়া   
     পথ দেখায়েছে মোরে,
     হুরী ও পরীরা ঝুরিয়া ঝুরিয়া  
     চাঁদের প্রদীপ ধরে
     পথ দেখায়েছে মোরে।
আমার নয়নে নয়ন রাখিয়া
কি বলিতে চাও, হে পরান-পিয়া!
      নাম ধরে তুমি ডাকো মোরে স্বামী
      ভোলো অভিমান ভোলো।। 

     তবু নির্নিমেষ, অপলক শুধু চেয়ে আছে মজনু! তার সামনে যে তারই প্রেমাস্পদ এভাবে নির্বিকার বসে থাকতে পারে, লাইলী আজ তা ভাবতেই পারছে না ! 
     এই সম্ভাব্য জাগতিক মিলনের চরম লগ্নে, প্রেয়সীর সামনেই একসময় দুই চোখ বন্ধ করে ফেললো মজনু- চিরতরে ! যে মিলন প্রত্যাশায় এই বৃক্ষতলে এতোদিন ধরে সে বসে রয়েছিল, আজ না জানি কোন দয়িতের সাথে হয়ে গেলো তার চরম মিলন ! 
       খুব আর বিলম্ব হয় নি, লাইলীও তার প্রেমের পথ অনুসরণ করলো। পাশাপাশি সমাধি প্রাপ্ত হলো দু'জন। ঘটে গেলো অপূর্ব মিলন ! 
       আবার ও বলি সেই কথা, মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির যে কথা বলা হয়েছিল ভুমিকায়: 
       "স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অজস্র পথ আছে। 
       আমি প্রেমকে বেছে নিলাম"। 
       হ্যাঁ, স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর রয়েছে অনেক পথ। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো প্রেম। সেই প্রেম যখন পবিত্র, সেই প্রেম যখন ঐকান্তিক ভাবে দয়িতের সাথে পরম মিলন প্রত্যাশী, সেই প্রেম যখন নশ্বরতাকে ডিঙিয়ে উত্তোরিত হয় অবিনশ্বরের দিকে, সেই প্রেম পৌঁছে দেয় স্রষ্টা পর্যন্ত। পরম প্রেমাস্পদের অমলিন প্রেমের ডোরে মিশে যায়- যেমন নদী তার স্বত্তা হারায় মহাসমুদ্রের বুকে আত্মনিবেদনের মাধ্যমে। এই জায়গায় এসে লাইলী মজনু প্রেমের চরম স্বার্থকতা। সকল সার্থকতার উর্ধে পরম কাঙ্ক্ষিত মিলনান্ত প্রেম গাঁথা ! 

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।