মানবিক রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা।

মানবিক রবীন্দ্রনাথের যে শিক্ষা আজ বড়ই প্রাসঙ্গিক।
                            -আ, ফ, ম,  ইকবাল॥

      বিশ্বের নানা প্রান্তে, বিশেষ করে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সভ্যতা সংস্কৃতির এই আঁতুড়ঘরে আজ যখন মানবতা ঠোকর খাচ্ছে পদে পদে, খুব মনে পড়ে বাঙালির চেতনার কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবিক অনুভূতি ও অবদানের কথা। 'নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান' যে দেশের পরিচয়, 'সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ' যে দেশের ঐতিহ্য, সেই দেশে আজ মানুষে মানুষে হানাহানি, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ বিসম্বাদ দেখে বারবার মনোজগতে জাগ্রত হয় মানুষের কবি, মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানব দর্শনের কথা।
      পঁচিশে বৈশাখ আমরা পেরিয়ে এসেছি।  ফের আসবে বাইশে শ্রাবণ। কেবল এই দুটো দিনই কি রবি ঠাকুরকে স্মরণ করার দিন ?
      না, রবি ঠাকুর আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক- সকল অনুভবে, নৈমিত্তিক জীবন যাপনের সকল পরিক্রমায় পথপ্রদর্শক। তাঁর দর্শন ভারতবাসীর পাথেয়। কিন্তু আজ আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তুলে রেখেছি বছরের দুটি দিনের আনুষ্ঠানিকতার জন্য।  
     ভারতবাসীর, বিশেষ করে বাঙালির মানসপটে চিরজাগরূক রবি ঠাকুর তাঁর কবিতা, সাহিত্যকর্ম, জীবনদর্শন, সংগীত, চিন্তাচেতনা সবকিছুই আমাদের জন্য হতে পারে সত্যিকার অনুপ্রেরণা। তিনি আমাদের মানবিক চৈতন্য ও প্রেরণার উৎস। পুরো মানবতার জন্য অনুপ্রেরণার স্রোত। তাঁর এই বিস্ময়কর ও বহুমুখী প্রতিভার জন্যই তিনি  কবিগুরু, গুরুদেব ও বিশ্বকবি অভিধায়  স্বার্থকভাবে অভিষিক্ত। একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, কথাশিল্পী, ছোট গল্পকার, সুরকার, চিত্রশিল্পী, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে গেছেন মানব কল্যাণের সকল পথ ও পন্থা। কবিগুরুই ভারতবর্ষের হাজার বছরের ঐতিহ্যলালিত দর্শন ও সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে গেছেন। প্রথম এশীয় হিসেবে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর  সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ যতটা মর্যাদার বিষয়, জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের পর নাইটহুড ত্যাগ ছিল ততোধিক মানবিক এবং দেশের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের পরিচায়ক।
        কবিগুরুর দার্শনিক চিন্তাসমৃদ্ধ স্বকীয় নান্দনিক ভাবনায় যেমন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে ' .... দেশের মাটি',  জল, আলো-বাতাস, ঠিক তেমনি কবিগুরুর ঐশ্বর্যমণ্ডিত সুবিশাল সাহিত্য ভান্ডারে প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, সৌন্দর্যদর্শন, চিত্ররূপময়তা, চিরায়ত অধ্যাত্মচেতনা, ইতিহাসচেতনা প্রভৃতি বিষয় আমাদের প্রতিনিয়ত করে তুলে বিমুগ্ধ। বহুমাত্রিকতায়ই খুঁজে পাওয়া যায় কবির প্রকৃত পরিচয়। দেশের মানুষের প্রাণে, চিন্তা-চেতনা ও মননে- এককথায় সমগ্র সত্তাজুড়েই রবীন্দ্রনাথ প্রবলভাবে বিরাজমান। রবীন্দ্রনাথ সবসময়ই প্রাসঙ্গিক, তিনি চির নতুনের কবি। বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও কালোত্তীর্ণ কবি। রবীন্দ্রনাথই একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যিনি সরাসরি দুটি সার্বভৌম দেশের জাতীয় সংগীত এবং ভাষান্তরে আরও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। বিশ্বের বুকে এমন মর্যাদা আর কোনো কবির ভাগ্যে জোটে নি। এবং ভবিষ্যতেও জুটবে বলে কল্পনা করাও দুরূহ ব্যাপার।
      রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচাইতে বড় পরিচয় তিনি একজন দার্শনিক। কবিগুরুর দর্শন ছিল মানবমুক্তির দর্শন। তাঁর কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস, সঙ্গীত, মোটকথায় সাহিত্যের সকল অঙ্গনে বিরাজমান তাঁর মানব দর্শন। তাঁর জীবন দর্শন। তিনি জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হৃদয়ের গহীনে লালন করেছেন মানব মুক্তির দর্শন। রবি ঠাকুর ছিলেন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে। তিনি বিশ্বাস করতেন বিশ্বমানবতায়। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ ও বিশ্বমৈত্রীবোধ অতপ্রতোভাবে বিজড়িত।
      মানবতাবাদ এমন একটি দার্শনিক মতবাদ, যা মানুষকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠে। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদের মূলে রয়েছে মানবিকতা, মানবকল্যাণ ও মানবমুক্তি। রবীন্দ্র দর্শনের একটি মৌলিক দিক হচ্ছে মনুষ্যত্ব, জাত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি প্রেম ও ভালোবাসা এবং নিজেকে পরার্থে বিলিয়ে দেওয়ার দিকদর্শন। মানুষকে বাদ দিয়ে বিশ্বজগৎ, পারলৌকিক জগৎ, সত্য, ধর্ম কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ নামক গ্রন্থে বলেছেন, ‘ধর্ম মানেই মনুষ্যত্ব- যেমন আগুনের ধর্ম অগ্নিত্ব, পশুর ধর্ম পশুত্ব। তেমনি মানুষের ধর্ম মানুষের পরিপূর্ণতা।’ তাই মূলত মানুষকে কেন্দ্র করেই ফুল্ল হয়েছে সমগ্র রবীন্দ্রদর্শন।
      ১৯৩০-৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ (ভ্রমণপত্রাবলি), ‘কালের যাত্রা’ (নাটিকা), ‘পুনশ্চ’ (গদ্যকাব্য), ‘Religion of Man’ (অক্সফোর্ড হিবার্ট-বক্তৃতা), ‘মানুষের ধর্ম’ (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত বক্তৃতা) প্রভৃতি রচনায় মানবধর্মের জয়গান করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এসব লেখনির মাধ্যমে মানব-ঐক্যবোধ পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বমানবতার উন্নিত স্তরে।
      রবি ঠাকুরের চিন্তা ও চেতনায় ছিল শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ। মুক্তচিন্তা ও মানব মুক্তির আদর্শে তিনি পোষন করতেন অগাধ বিশ্বাস। তাঁর ভাষায়, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে, সে মানুষ। আজকের দিনে এই কথা বলবার সময় এসেছে যে, মানুষ সর্বদেশের সর্বকালের। তার মধ্যে কোনো জাতীয়তা বা বর্ণভেদ নেই।’ 
      শান্তি, সাম্য ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথের ছিল মানুষের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও সুগভীর প্রত্যয়। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’।
      রবীন্দ্রনাথ মানব জীবনের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে, জ্ঞানের পথে এবং কূপমণ্ডুকতা ও সংকীর্ণতা দূর করে সম্প্রীতির পথে চলার উৎসাহ যুগিয়ে গেছেন আজীবন।  ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’- এই সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের পথে অভিসারী হয়ে উঠার প্রেরণা জুগিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় মননকে বিশ্বমানে অধিষ্ঠিত করেছেন।
      ঔপনিবেশিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে স্বদেশবাসীকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, স্বাধীকার  আন্দোলনের জন্য নিবিষ্ট  সংগ্রাম এবং ভারতবাসীর মুক্তির পথ প্রদর্শক রূপে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পথপ্রদর্শক। তাঁর অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, সংগীত ও বক্তৃতায় রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম, স্বদেশ, মুক্তি প্রভৃতি নানা বিষয়ে সৃজনশীল লেখনীর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন দেশবাসীকে। রবি ঠাকুরের কবিতা, গান, সাহিত্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিরন্তর প্রেরণা জুগিয়েছে।
    জাতীয়তাবাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করার লক্ষ্যে পরাধীনতার সেই যুগে যে সকল কবি সাহিত্যিক দেশবাসীর কাছে অনুপ্রেরণার স্রোত হিসেবে কাজ করে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম।   
     সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা, মহামারি, শোক ও শঙ্কায় মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথের লেখনী আজকের অস্থির-অশান্ত আবহে আমাদের জন্য ভরসার উৎস হতে পারে। সংঘাত-সাম্প্রদায়িকতা আর বৈষম্যের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ শান্তি-অসাম্প্রদায়িকতা আর সাম্যের দর্শন তুলে ধরেছেন বিশ্ববাসীর কাছে। সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রকৃত মানবতাবাদী এবং  অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি।
     অতি সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের দেশের পারম্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্য বিনাশের লক্ষ্যে কিছু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। এসব সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বারবার তাদের রূপ পরিবর্তন করে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, রাজনৈতিক উস্কানি ও সাম্প্রদায়িকতার কালো থাবা দ্বারা বারবার আমাদের দেশের শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠানে বিভিন্নভাবে আঘাত হানছে। এদেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য যেকোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে। রুখে দিতে হবে সকল সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে।
      আজকের এই এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যভাবনা, জীবনদর্শন, সৌন্দর্যদর্শন, সাম্য ও শান্তির বাণী, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমাজে প্রতিষ্ঠা এবং রবীন্দ্রচর্চাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে আমরা একটি মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবেই ধ্বংস হবে এদেশের সাম্প্রদায়িক অপশক্তি গুলো।
      পরিশেষে কবিগুরুর আবেদনের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে নিবেদন করি সেই প্রার্থনা-
     " অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে-
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে.." ॥
                                ৩০-০৬-২০২২
                                --------------
মসনবী পরিচিতি।

     মসববী। হ্যাঁ, বলছিলাম মসনবী-র কথা। মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী-র শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মসনবী। আগের পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম মসনবী-র জন্মলগ্নের কথা, অর্থাৎ মসনবী রচনার প্রেক্ষাপট। তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু  তাবরেজি-র সান্নিধ্য লাভ, দীক্ষা গ্রহণ এবং সেই পথ ধরে মসনবী রচনার দিকে এগিয়ে চলার কথা।
       আজ, জুন মাসের এই শেষ দিনে, অর্থাৎ সাময়িক বিরতিতে যাবার প্রাক্কালে, খুব সংক্ষিপ্ত আকারে আমরা পরিচয় করে নেবো 'মসনবী'র সাথে।
        মসনবী বা মসনবী-ই মা'নবী  হলো মাওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি রচিত একটি বিখ্যাত ফার্সি সুফী কবিতা সংকলন। সুফিবাদের উপর রচিত এটি সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী রচনাগুলোর মধ্যে একটি।  
         মসনবী মোট ছয়টি কবিতা বইয়ের একটি সংকলন। আধ্যাত্মিক ধাঁচের এই লেখনীটি কীভাবে বিশ্বস্রষ্টার সাথে প্রেমের লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, তার শিক্ষা দেয়। মসনবীতে মূলত ক্বুরআন ও আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কিত রুমির গভীর উপলব্ধির বর্ণনা রয়েছে। 
        মসনবী হলো আল-ক্বুরআন, হাদীস ও প্রাত্যহিক ঘটনা থেকে নেওয়া সংক্ষিপ্ত কাহিনী বা গল্প। গল্পগুলো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সবগুলো নীতিকথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন রকমের ইসলামি জ্ঞানের সমাহার রয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে এতে ব্যক্তিগত সুফিবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রুমির 'দিওয়ান ' বইয়ের সাথে তুলনা করলে এটি তুলনামূলকভাবে পরিমিত মাত্রা মেনে চলে। এতে আধ্যাত্মিক জীবনের বিভিন্ন দিক এবং সুফিবাদের শিষ্যত্ব গ্রহণকারী বা যারা জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তাদের অনুশীলন সম্পর্কে রয়েছে বিষদ বর্ণনা।
        রুমি তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে মসনবী লেখা শুরু করেন। তিনি ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ৫৪ বছর বয়সে প্রথম বইটির লিখতে  শুরু করেন এবং ১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত লিখতে থাকেন। ষষ্ঠ ও সর্বশেষ বইটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
        রুমি তাঁর প্রিয় শিষ্য হুসাম-আল-দীন চালাবির অনুরোধে মসনবী লিখতে শুরু করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। চালাবি পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে রুমির অনেক অনুসারী 'সানাই' ও 'আত্তার' বই দুটি গুরুত্বের সাথে পড়েছিলেন। ফলে রুমি সানাই ও আত্তার-এর মত নির্দেশের ভাষ্যে আরেকটি রচনায় হাত দেন। রুমির অনুসারীরা বিভিন্ন সভায় তাঁর সাথে দেখা করতেন।সেখানে তিনি মসনবীর পদ্যগুলো আলোচনা করতেন। চালাবি সেগুলো লিখে রাখতেন এবং পরে তাঁকে আবৃতি করে শোনাতেন।

     মসনবীর  বিষয়বস্তু ও বর্ণনাশৈলীঃ
    মসনবীর ছয়টি বইকে দুটি যুগল করে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। কারণ দুটি যুগলে একই রকম বিষয়বস্তু নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
     প্রথম বই দুটিতে নাফস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নাফস হল নিম্ন প্রবৃত্তি, আত্ম-প্রবঞ্চনা ও কু-অভ্যাস।
       তিন এবং চার নম্বর বই দুটিতে কারণ(causes) ও জ্ঞান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই দুটি বিষয়ের ক্ষেত্রে রুমি বাইবেলীয় ও আল-ক্বুরআনে বর্ণিত নাবী মূসা(আঃ)কে চিত্রিত করেছেন।
       শেষ দুটো বইয়ে একটি সার্বজনীন ধারণার কথা বলা হয়েছে। যেখানে মানুষকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে হলে তার ঐশ্বরিক শারীরিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে হবে।
     প্রতিটি বইয়ে একই ধরনের বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে আলোকপাত করা হলেও রুমি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি বর্ণনা করেছেন। রুমি তার লেখনীতে সাতটি প্রধান ভাষ্য ব্যবহার করেছেন।
      একজন সুফি শিক্ষক হিসেবে তিনি আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি সৃষ্টিকর্তাকে 'আপনি' এবং মানবজাতিকে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেছেন।
       গল্প-কথকের ভাষ্য হিসেবে রুমি বিভিন্ন উক্তির ব্যাখ্যা প্রদানে গল্প আকারে বর্ণনা করেছেন। মাঝে মাঝে কোন একটি বিষয়কে স্পষ্ট করতে শতাধিক ছত্রও ব্যবহার করেছেন। কোনো কোনো উক্তির ব্যাখ্যা প্রদানে সাদৃশ্যের ব্যবহার করেছেন।
      অনেকগুলো গল্প চরিত্রাবলির মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন নৈতিক প্রতিফলন বিধিবিধান গুলো কিছু  ক্বুরআন ও হাদীস থেকে সরাসরি উক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
      রুমি কিছু ক্ষেত্রে তার পদ্যে প্রশ্ন রেখেছেন এবং লিখেছেন যে, তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারবেন না, কারণ পাঠকেরা তা বুঝতে পারবে না। 
    
      মাওলানা রুমি(রাহঃ) মসনবী-র একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা আরবি ভাষায় লিখেছেন।তাতে তিনি মসনবী শরীফের যে পরিচয় তুলে ধরেছেন,  সংক্ষিপ্ত আকারে তা হলো-
     "এই মহাগ্রন্থ "মসনবী" 'মা' ও 'নবী' এই দুই পংক্তি বিশিষ্ট আধ্যাতিক বিজ্ঞান আলোচনা কাব্য। এটি বাস্তব সত্য এবং আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার রহস্য উদ্ঘাটনে দ্বীন ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের আলোচনায় লেখা। এটা আল্লাহ প্রদত্ত বৃহৎ সুগভীর জ্ঞানমালা, উজ্জ্বল পথ, সর্ববিজয়ী প্রমান। এর আলো তেজোময় উজ্জ্বল প্রদীপরূপী। এ থেকে দীপ্ত প্রভাত অপেক্ষা অধিক আলো বিচ্ছুরিত হবে। এটা আধ্যাতিক উদ্যান, অন্তজগতের স্বর্গ, বেহেশতী ঝর্ণা ও বৃক্ষ-লতায় সুসজ্জিত, যাতে "সাল-সাবিল" নামক মনোরম ঝর্ণাধারা  রয়েছে। যারা আধ্যাতিক জগতের পদাধিকারী এবং সম্মানিত, এতে তাদের চিত্তবিনোদনের উত্তম ও সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। পবিত্র লোকগণ এটা উপভোগ করবেন এবং আনন্দ লাভ করবেন। এটা মিসরের নীল নদের ন্যায়- তা নেক লোকদের জন্য পানি এবং ফিরআ'উন গোষ্ঠী ও অবিশ্বাসিদের জন্য রক্ত  হয়ে যেতে পারে। যেরূপ পবিত্র ক্বুরআন সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআ'লা বলেছেন, "অনেকের জন্য গোমরাহীর কারণ হবে এবং অনেককে হিদায়ত দান করবে।"
      আমার এই গ্রন্থ অন্তর রোগে আরোগ্যদান ও অভ্যন্তরীণ ময়লা পরিষ্কার করবে, ক্বুরআনের সঠিক অর্থ উজ্জ্বলরূপে প্রকাশ করবে, রিযিকে প্রশস্ততা আনবে, চরিত্র নির্মল করবে। এটা পবিত্র হস্তে ধরার যোগ্য। অপবিত্র হাতে ছোঁয়াও নিষিদ্ধ। সারা জাহানের প্রভুর তরফ থেকে প্রদত্ত, অসত্য ও মিথ্যা কোনো দিনই এতে স্থান পায়নি। আল্লাহ তাআ'লা একে হেফাযত করবেন। তিনি সর্বোত্তম হেফাযতকারী, পরম দয়ালু ।
      এই গ্রন্থের আরও অনেক গুণ-বৈশিষ্ট রয়েছে, যা আল্লাহ তাআ'লা অবগত করেছেন। আমি অল্পতেই ক্ষান্ত করলাম, যা অধিকের ইঙ্গিত বহন করে।"
      মোটকথা, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী(রাহঃ)-র ২২ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হলো মসনবি শরীফ। যা সুবিশাল ৪০ হাজার লাইনের একটা মহাজ্ঞান ভান্ডার ।
     হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রিসার্স স্কলার এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত সামির আসাফ  'The Poet of the Poets'- শীর্ষক এক নিবন্ধে লিখেছেনঃ গভীরতার মানদণ্ডে রুমির তুলনায় শেক্সপিয়রের মান হচ্ছে মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ৷ পশ্চিমা সাহিত্যিকদের মান প্রসেঙ্গ তিনি আরো লিখেছেন, “পাশ্চাত্যের গ্যাটে, চসার ও ইমারসন পর্যন্ত রুমির প্রভাব প্রতিপত্তি উপলব্ধি করতে পেরেছেন ৷ এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, রুমির সমকক্ষ যেমন ইমাম গাজ্জালি, গা'লিব, জামি, শাদী, জিবরান, এমনকি কাজমী সাহিত্যকর্মের তুলনায় পশ্চিমা সাহিত্য বলতে গেলে হাস্যকর পর্যায়ের অগভীর"।
     বলতে গেলে রুমি পরবর্তী সাহিত্য ধারায় এমন কবি খুব কমই আছেন যার উপর মাওলানা রুমি এবং তাঁর মসনবী-র প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। উপমহাদেশের দুই স্বনামধন্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যেও আমরা দেখতে পাই রুমির আধ্যাত্ম দর্শনের ব্যাপক প্রভাব। 
     রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্তি পর্বের কবিতা ও গানগুলোর মধ্যে রুমির প্রভাব এতোটাই ব্যাপক যে কখনও ধন্দে পড়ে যেতে হয়- রুমি পড়ছি, না রবিঠাকুর !
     নজরুল তো স্বতন্ত্রভাবে মাওলানা রুমির অনুবাদ করে গেছেন। এবং তাঁর রচনায় সুফী ভাবধারার প্রভাব স্বীকার করে গেছেন। 
     পরিশেষে মাওলানা রুমির একটি কবিতা দিয়ে সমাপ্ত করতে চাইবো এই লেখাটি।
    
    “আতেশাস্ত ইঁ বাংগে সায়ে ও নিস্তে বাদ,      হরফে ইঁ আতেশে নাদারাদ নিস্তে বাদ।”
   
      অর্থ: বাঁশির সুর আগুনের ন্যায় অন্যের অন্তর প্রজ্জ্বলিত করে চলেছে। বাঁশির সুরে যার অন্তঃকরণ জ্বলে না উঠে, তার অন্তঃকরণ না থাকা-ই ভাল। এমন অন্তঃকরণ ধ্বংস হওয়া-ই উত্তম।

     ভাব: প্রকৃত খোদা-প্রেমিকের সাহচর্যে থাকলে, তার অন্তরেও খোর-প্রেম জাগরিত হয়ে উঠে। অর্থাৎ কোনো ওলি-আল্লাহ্'র সাহচর্যে থেকেও যদি কেউ নিজেকে খোদার দিকে ধাবিত করতে না পারে, তার সংসর্গ না থাকাই শ্রেয়।

     তথ্যসূত্রঃ
     ১।  করিম জামানী। তাফসির মসনবী, মা'নবী।
    ২। মিফতাহুল উলুম -শরহে মসনবী।

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।