কিছু কথা, কিছু উপলব্ধি ।

আত্মানুভূতি বা উপলব্ধি একটি ধনাত্মক বোধ বা বুদ্ধিবৃত্তি। এর হয় সাধারণত দুটি স্বরূপ- বহির্মুখী এবং অন্তর্মুখী । বহির্মুখী উপলব্ধিতে বহির্জাগতিক, অর্থাৎ নিজের ভৌতিক পরিমণ্ডলে যত চেতন-অবচেতন পরিদৃশ্য উদঘাটিত বা শনাক্ত হয়, তা দাগ কাটে আমাদের চেতনায়, আমাদের সংজ্ঞানে। তাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার প্রকাশ ঘটে আমাদের অভিব্যক্তিতে, আমাদের ভঙ্গিমায়। এই অভিব্যক্তির প্রেক্ষিতে আমরা অতি সহজেই বিচার বা বিশ্লেষণ করতে বসি অন্যের দোষগুণ, অপরের বৈশিষ্ট্যাবলি। 
       আমাদের মানবিক চেতনা দুই প্রকারের অনুভূতির সমন্বয়ে বিগঠিত- জৈবিক এবং মানবিক। জৈবিক চেতনা জন্মগতভাবে প্রত্যেক জীবের মধ্যে এক সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু মানবিক চৈতন্য গড়ে তুলতে হয় সাধনার মাধ্যমে, অর্জিত প্রজ্ঞা তথা সামগ্রিক লালনের মাধ্যমে। সুতরাং জৈবিক চেতনাকে নিয়ন্ত্রিত তথা বশীভূত রাখতে আবশ্যক হয় মানবিক চৈতন্যের উন্মেষ । 
       এই মানবিক চৈতন্যের আবার দুটি ধাপ। প্রথম ধাপের খোরাক হচ্ছে পারিপার্শ্বিক জ্ঞানান্বেষণ, জাগতিক উপলব্ধির পরিশীলন এবং দৈনন্দিন জীবনে তার যথোচিত বাস্তবায়ন । প্রেম ভক্তি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর সুশীল মনন হচ্ছে তার সিঁড়ি সমুহ। 
       মানবিক চৈতন্যের দ্বিতীয় তথা উন্নততর ধাপটি হচ্ছে অতিমানবীয় অনুশীলন- যা সচরাচর বা সাধারণ্যে সম্ভবপর নয়। এই সমুন্নত পর্যায়ে পৌঁছাবার জন্য যুগে যুগে কিছু বিশেষ ব্যক্তিত্ব অকল্পনীয় ত্যাগ তথা সাধনার পথ পাড়ি দিয়েছেন। কেউ পারিপার্শ্বিক জগতকে ত্যাগ করে চলে গেছেন নির্জন নিবিড় তুর পাহাড়ে, কেউ রাজমহল ত্যাগ করে বছরের পর বছর সাধনা করে বোধিলাভ করেছেন, কেউ চলে গেছেন দণ্ডকবনে, কেউ চড়েছেন হেরা পর্বতের গহন গুহায়, কেউ পরার্থপরতার অমৃত বাণী প্রচার করেছিলেন 'রাবাব' বাজিয়ে। 
       মানবিক উৎকর্ষ সাধনের দুটি ধাপের মধ্যে যে ফারাকটা অতীব তীব্রভাবে পরিলক্ষিত, সেটি হচ্ছে দৃষ্টিকোণ বা দৃষ্টিভঙ্গি । জাগতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে অর্জিত পরিজ্ঞান সাধারণত বহির্মুখী । বাইরের অবকাঠামো এর মাধ্যমে যতটা দৃষ্টিগোচর হয়, আপনার অভ্যন্তরীণ সামর্থ্য অসামর্থ্য, দোষগুণ ততোটা উপলব্ধ বা প্রকটিত হয় না। তাই তথাকথিত এক বিশাল সংখ্যক প্রাজ্ঞরাও অপরের ত্রুটি বিচ্যুতি, স্বভাব চরিত্র, প্রকৃতি নিয়ে যতটা বিচার বিশ্লেষণ করে থাকেন, ঠিক ততটাই উদাসীন রয়ে যান আত্মোপলব্ধি বা আত্মবিশ্লেষনের ক্ষেত্রে। 
       কিন্তু যাদের মধ্যে একাধারে দুটি স্বত্বার সমন্বয় বিরাজ করে, অর্থাৎ জাগতিক পরিজ্ঞান তথা শিক্ষার সাথে সাথে অতিজাগতিক গুরুর সম্যক দীক্ষার ধারা সমভাবে প্রবাহিত, তাঁরাই সফল জীবন পথের বাস্তব যোদ্ধা। শাস্ত্রের জ্ঞান এবং মুকুরের প্রতিবিম্ব- এই দুই অণুর সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উৎকীর্ণ হয় তাদের মানবিক উৎকর্ষ সাধন । 
       আমি কোন ব্লকে অবস্থান করতে চাইবো, সে হবে আমার ঐকান্তিক নির্ণয় ।

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।