* মনে রবে কি না রবে আমারে *

       অনুসন্ধান করছি সেই ছেলেটির, যে বেড়ে উঠেছিল এক অজ পাড়াগাঁয়ে। এক অতি সাধারণ পরিবারের প্রতিনিয়ত প্রত্যাহ্বানের মধ্য দিয়ে। নিতান্ত শিশুকাল থেকেই যে ছিল নানা ধরনের রোগব্যাধির শিকার। দুর্বলতা অক্ষমতার জন্য পাড়ার ছেলেরা খেলাধুলায়  যাকে তাদের টিমে নিতে চাইতো না! বড়বন্দের জাঙ্গালে বসে বসে সে চেয়ে দেখতে থাকতো সমবয়সীদের খেলা। কখনও মুখ তুলে তাকিয়ে থাকতো বিশাল নীল আকাশের দিকে। আকাশ কিন্তু কখনো তাকে টিম থেকে বার করে দেয় নি! তাই আকাশে উড়তে থাকা পাখিগুলোর সঙ্গে গড়ে উঠেছিলো তার এক নিবিড় সখ্যতা। পাখিগুলোকে সে যেমন জানতো, পাখিরাও তাকে যেন চিনতো !  
       কর্দমাক্ত পথ দিয়ে গ্রামের পাঠশালায় যাবার পথে সঙ্গীদের সাথে পতপত করে চলার ক্ষমতাটুকুও তার ছিলনা। কতদিন পথ পিছলে পড়ে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল! পাঠশালার গণ্ডি পেরোনোর আগেই পাণ্ডুরোগ আঁকড়ে ধরেছিল সেই দুর্বল ক্ষুদ্র দেহটাকে। পাঁচ কিলোমিটার দূরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে যখন দিন কাটাচ্ছিল, সঙ্গীরা তখন দিচ্ছে তৃতীয়মানের ষান্মাসিক পরীক্ষা! শেষ পরীক্ষার আগের দিন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছিল যদিও, পরীক্ষায় বসার না ছিল পুঁজি, না সামর্থ্য। তবু নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি, কাঁদা ভেঙে চলে গিয়েছিল পরীক্ষা দেখতে। জ্বলজ্বল চোখে দূরে থেকে দেখছিল সহপাঠির পরীক্ষা দেওয়া। কোন মুহুর্তে দেখে ফেললেন হেডমাস্টার। ডেকে নিলেন ভেতরে। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিয়ে বললেন, ভালো করে পড়ে বার্ষিক পরীক্ষা দেবে। খুব ভালো পরীক্ষা হবে তোমার!  
       পরের বছর সেই 'বেমারি' ছেলেটি ভর্তি হলো গিয়ে তিন কিলোমিটার দূরের এমই মাদ্রাসায়- নিউ ফাইভে। দুর্বলতা চরমে, সঙ্গীরা ছেড়ে আসতো পথে!আধা ঘন্টা চল্লিশ মিনিটের পথ, কখনও লেগে যেতো দুই ঘণ্টা ! এমনি করে পরের বছর ক্লাস নিউ সিক্স । পা আর শরীরের থাকতো না মেলবন্ধন। একদিন সঙ্গীরা এসে ছেলেটার বাড়িতে গিয়ে খবর দিলো- রইস আলীর রাইস মিলের পাশের গাছতলায় শুয়ে আছে! তার আব্বা সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে নিয়ে এলেন কাঁধে করে । - না, আর স্কুল নয়, সুচিকিৎসার ব্যবস্থা এবার করতেই হবে! ডাক্তার দত্ত বাবু বলে দিলেন দেখাতে হবে শিশু বিশেষজ্ঞ, শিলচর নিয়ে । উপায়ান্তরহীন এক বাপ, ঝিমিয়ে পড়া সন্তানের মুখ চেয়ে এগিয়ে যেতেই হলো। শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানে আজকের সিভিল হাসপাতাল। কিন্তু শিশু বিভাগ আর আইসোলেশন ওয়ার্ড ঘুংগুরে । না, ঘুংগুরে তখন হাসপাতালের কোনো কাঠামো নেই। মাটি ফুঁড়ে প্লিন্থ উঠতে শুরু করেছে মাত্র। বর্তমানের ডক্টরস কলোনির দক্ষিণ পাশের আসাম টাইপের ব্যারাক ধরণের সেই ঘরটি আজো আছে, সেখানেই ছিলো শিশু বিভাগ। সবেধন একটামাত্র দোকান ঘুংগুর এলাকায়। গ্রোসারি কাম চায়ের। পাওয়া যেতো চিড়া মুড়িও। যাতায়াত বলতে একটিই সরকারি লাল বাস- হাইলাকান্দি শিলচর। সকাল দশটার দিকে পৌছাতো ঘুংগুর। ফিরতো বিকেল একটার পর। সেই লালবাসটিই ছিল ছেলেটির আর তার বাবার জিয়নকাঠি । খাবার খেতে চলে যেতেন মেহেরপুর। হোটেলে খাবার খেয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করে লালবাসে করে ফিরতে ফিরতে প্রায় দুটো। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার- কলিজার টুকরোর জন্য। কিছু খেতো, কিছু রেখে দিতো রাতের জন্য। লাচার বাপের রাতের খাবার ওই দোকানের চিড়া মুড়ি! এমনি করে মাসাধিক কাল। 
       প্রাণপ্রিয়কে নিয়ে ফিরলেন যদিও, লিকলিকে ধড়টার মধ্যে তখনও নেই চেতনা।দিনকয়েক পর থেকে আবার স্কুল! কোনক্রমে! জীর্ণ শীর্ণ হলেও শিক্ষকদের, বিশেষ করে হেডমাস্টারের পরম স্নেহভাজন। ইংরেজি পড়াতেন হেডমাস্টার স্যার। একদিনের ঘটনা। বছরের শেষের দিকে। স্যার পড়াচ্ছেন tense, এক একটি শব্দ লিখে তার  present past future ফর্ম তুলে ধরছেন। সঙ্গে সঙ্গে conjugation . পিওন এসে বললো কোনো ভিজিটর এসেছেন, স্যারের সাথে কথা বলবেন। -আসছি, বলে পাঁচটি শব্দ লিখলেন ব্ল্যাকবোর্ডের নিচের দিকে। নাম ধরে ডাক দিলেন ওই লিকলিকে ছেলেটিকে। -এসো, হাতে চক ধরিয়ে বললেন, এই ওয়ার্ড গুলোর past এবং future form লিখে সবাইকে বুঝিয়ে দাও । আমি আসছি। টাস্ক শেষ হতে না হতেই স্যার ফিরলেন। -হয়েছে, সবাই বুঝেছো? চুলপড়া মাথায় হাত বুলিয়ে, পিট চাপড়ে দিলেন হাড় ঝিরঝিরে সেই পুঁচকে ছেলেটির। -বাবা, তুমি অনেক উপরে যাবে । 
     সেই দিন, সেই ক্ষণে ছেলেটি লাভ করেছিল তার নবজন্ম! সেদিনই সে অনুভব করতে পেরেছিলো যে জগতে তারও মূল্য আছে, এমন কেউ আছে যে তাকে বিশ্বাস করে, তার প্রতি আস্থা রাখে,তাকে টিমে নিতে চায়!
     সেদিন ঘরে ফিরে কাগজ কলম নিয়ে কিছু একটা লিখেছিলো ছেলেটি। আব্বার বাক্স থেকে ইনল্যান্ড লেটার একটি বের করে সেই আঁকিবুকিটা কপি করে পরদিন ছেড়ে দিয়েছিলো লাল ডাকবাক্সে, টেইলার হান্নানদার সহায়তায় । আজাদ পত্রিকার ঠিকানায়। ছাপা হয়ে আসার পর বুঝতে পেরেছিলো সেটা নাকি কবিতা ! যা দেখে তার আব্বা দিয়েছিলেন আট আনা পুরস্কার। শামসুল চাচা এসেছিলেন সেদিন তাদের বাড়ি। তাঁর পুরস্কার ছিল পুরো এক টাকা ! অভাবনীয় ! হাতে আসমান পাওয়া আর কাকে বলে! সেবার বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট, বনাম গণ্যতার মধ্যে ঢুকে যাওয়া। 
     শৈশবে যে ছেলেটা আকাশের প্রেমে মশগুল থাকতো, উড়তে চাইতো পাখিগুলোর সঙ্গে, অতঃপর যৌবনের এক পর্যায়ে সে উড়ান ভরলো। উড়তে উড়তে খানিকটা, না না অনেকটা উপরে। ছিল যে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৩ ডিগ্রি উপরে, ঠাঁই নিলো অবশেষে ৯৬৬ ডিগ্রি চড়ে! হ্যাঁ, সেদিন হেডমাস্টার স্যার মাথা বুলিয়ে দিয়ে যাকে বলেছিলেন- তুমি অনেক উপরে যাবে বাবা, জানা নেই হয়তো এরকম কোনো পাথুরে পাহাড়ের কথাই বলেছিলেন ! অবশেষে এক পাহাড় চূড়ায় খড়কুটো দিয়ে তৈরি করলো একটা ছোট্ট নীড়! খড়কুটোর সেই নীড়ে একসময় ফুটে উঠলো দুটি ফুটফুটে ছানা! সেই ছানাগুলো ও আজ উড়তে শিখে গেছে। তাই মনে হচ্ছে বাল্যের সেই রোগব্যাধি ক্লিস্ট ছেলেটি তার দায়ভার সম্পন্ন করে নিয়েছে। এবার তার ছুটির পালা ! ফিরে যেতে চায় সেই বাবার কাছে যিনি কোলে পিঠে করে, জীবন বাজি রেখে মানুষ করে তুলতে ছিলেন সদা সচেষ্ট ! সেই মায়ের কাছে, বুকের দুধ শুকিয়ে যাওয়ায় গলার কণ্টিহার বিক্রি করে যোগাড় করেছিলেন দুধের গাই ! 
     প্রতীক্ষা, ঘণ্টা কখন বাজবে !
     ৩ শাওয়াল,১৪৪১ হিজরী,‌
     ২৭ শে মে, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ ।
      

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।