* সংসার সমরাঙ্গনে * সংসারি পুরুষদের দুইবিধ দায়বদ্ধতা থাকে। একটি বাইরে, কর্মক্ষেত্রে, অপরটি ঘরের, গৃহপরিচালনার। প্রথমটিতে প্রায় সবাই কমিটেড, পুরোপুরি দায়িত্বশীল। সময় সম্মন্ধে যেমন সচেতন, তেমনি কর্মস্থলের দায়বদ্ধতা পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের বোঝাপড়া বা এডজাস্টম্যান্ট করে নিতে সবাই অভ্যস্ত। কিন্তু সেই 'ভদ্রলোক'দের একাংশ ঘরে এলেই ছোঁয়াছুঁয়ি রোগ পেয়ে বসে! এটি হলোনা, ওটি হচ্ছেনা কেন ? ঘরদোর এতো ময়লা কেন আজ ? খাবার তৈরি হতে এতো বিলম্ব কেন? বাচ্চাদের কাপড়চোপড় পাল্টানো হলোনা কেন? এমনতর নানান অভিযোগ ! এ্যডজাস্টম্যান্ট বস্তুটি যেন বাইরের জিনিস, তাই বাইরেই রেখে আসেন! অথচ সুখী কর্মজীবনে এডজাস্টম্যান্ট যতটা আবশ্যক, তার চাইতে অধিক আবশ্যকতা রয়েছে সুখী সংসার গড়ে তোলার জন্য। কর্মজীবনের রয়েছে নির্দিষ্ট সার্ভিস কোড। কিংবা ব্যাবসা-পাতিতে নির্দিষ্ট নীতিবিধান। কিন্তু গার্হস্থ্য জীবনের জন্য সকল নীতিমালা নিজেদের গড়তে হয়, নিজেরাই ভাঙতে হয়। যখন যেভাবে যেমন আবশ্যকতা, তেমনি তার পরিবর্তন পরিবর্ধনের মাধ্যমেই সংসার গড়ে উঠে সুখের কানন স্বরূপ। ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্ধারিত সময়ের ডিউটি সেরে আপনি ফিরলেন সেই সংসারে, যে সংসারে আপনার সহধর্মিনী রুটিন মেনে সংসারের ঘানি টেনেই চলেছেন! আজকাল আবার অনেক গিন্নি নিজেও সার্ভিস করেন, তিনিও আপন ডিউটি সেরে ঘরে ফিরেছেন। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরে যে পরিচ্ছন্ন বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আপনি সুখের গান গাইলেন- তুঝে সু্রজ কহুঁ য়া চান্দা, তুঝে দ্বীপ কহুঁ য়া তারা, মেরা নাম করেগা রওশন......., লক্ষ্য করেছিলেন সেই সন্তানটি নিয়ে তার মা রাতভর কি যাতনাই সয়ে উঠেছেন? কতবার উঠতে হয়েছে তার 'মুতের তেনা' বদলাবার জন্য? রাতভর দুধ খাওয়াতে গিয়ে মর্জি মতো পাশ ফিরতেও পারেননি! এরপরও কতটা সময় লেগেছে সকালবেলা তাকে হাগু করিয়ে ড্রেস পাল্টে পরিচ্ছন্ন করতে! ঘরে যাকে রেখে গেলেন, তার কোনো নির্ধারিত সার্ভিস রুল বা কোড বলেতো আর কিছু নেই, তাই আপনি ভাবতেই পারেন- ঘরে আর কি কাজ? এই যে সকালবেলা নাস্তার সঙ্গে মুরগির ডিমটা খাচ্ছেন, অথবা বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছেন, জানেন সেই মুরগির পেছনে একজন গৃহিণিকে কতটা সময় দিতে হয় ? কিচেন গার্ডেনের তরতাজা সব্জির বিকল্প নেই- ফুটানি করে বাইরের বন্ধুদের বলতে আমরা গর্ব করি। কিন্তু সেই কিচেন গার্ডেনের জন্য কি নির্দিষ্ট কোনো শ্রমিক আপনি নিযুক্তি দিয়ে রেখেছেন? না, তার আবশ্যকতা বোধ করেননি, কেননা আপনার গর্ব আপনার গিন্নি এসবে খুব উস্তাদ! উনি যদি কর্মী বা চাকরিজীবী হোন, তাহলে খুব ভালো করে স্মরণ করুন, আপনি কি কখনো স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগটি গুছিয়ে দিয়েছেন? অথচ আপনার পার্সটি, আপনার রুমাল, আপনার কাগজপত্র- এমনকি আপনার পরিধেয় বস্ত্র কোনটি কোথায়, সেসব দেখে দিতে হয় ওই ২৪×৭×২৬৫ কর্মিকে ই ! ভাবুন তো- এসব কি অপবাদ দিচ্ছি শুধু শুধু, না কি এ এক প্রতিনিয়ত বাস্তব! আল্লাহপাক সংসারিদের সম্মন্ধে বলেছেন যে তিনি সৃষ্টি জগতকে 'যুগল' করে সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে একে অন্যের মধ্যে স্বস্তি খুঁজে পায়। এবং সেই যুগলের মধ্যে আবার সৃষ্টি করেছেন 'প্রেম' এবং 'করুণা'- যার মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে তৈরি হয় এক অনন্য মেলবন্ধন । এই যে প্রেম এবং করুণার মেলবন্ধন, তার বাস্তবায়ন আমরা খুবই পরিচ্ছন্ন দেখতে পাই অন্যান্য প্রাণীর জীবন ধারায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তার অভাব পরিলক্ষিত হয় সেরা সৃষ্টি মনুষ্য জীবনে! প্রাথমিক সংসারি জীবনের অন্যতম আকর্ষণ যদি প্রেম হয়, পরিণত জীবনে একে অপরের জন্য আল্লাহ তা'আলার নির্বাচিত করুণা স্বরূপ। যৌবন কালে সারা জগত ঘুরে যে প্রেম খুঁজে বেড়ায় বাউণ্ডুলে মানুষটি, যৌথ জীবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে এসে যায় অটোমেটিক নিয়ন্ত্রণ! পরস্পরের সান্নিধ্য আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এগিয়ে চলে সংসারের উত্তরণ। এই যে সংসার জীবনের যৌথ যাত্রা, সেখানে সব দায়বদ্ধতাকে ভাগ করে নিতে হয় যৌথভাবে। তবেই সংসার গড়ে উঠে সুখের, সমৃদ্ধির এবং কল্যাণকর এক কানন । আর হ্যাঁ, ওই যে 'করুণা', তা কিন্তু কেবল বুড়োবুড়ির একান্ত স্বত্ব বলে ভাবা উচিত নয়। একথা ঠিক যে একটা সময় হয়, ছেলে মেয়ে বাইরে চলে যায়। অথবা তাদের নিজেদের দায়বদ্ধতায় মশগুল হয়ে যায়। তখন বুড়োর বুড়ি ছাড়া উপায় নেই ! কথায় কথায় 'কই গো', 'কোথায় গো' লেগেই থাকে! কিন্তু আল্লাহপাক যেহেতু প্রেম এর সাথে সাথেই করুণার উল্লেখ করেছেন, তাই সারা জীবন ধরে আমাদের সেই উপলব্ধি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে যে- যেখানে প্রেমের দেওয়া নেওয়া, সেখানেই বইতে হবে করুণার হাওয়া ! আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে সুখী সমৃদ্ধ এবং তাঁর নির্দেশিত এবং তাঁর বার্তাবাহকের প্রদর্শিত পন্থায় সংসার জীবন নির্বাহ করার তাওফিক দান করুন !

Comments

Popular posts from this blog

TO OUR SON (ON HIS GRADUATION).

সমকালীন ভাবনা ।

মিনতি।