সত্র-দর্শন
সত্র-দর্শন
~~~~~~~
বিশাল বক্ষ গঙ্গাধর নদী। বয়ে চলেছে কুলুকুলু ধারায়। তার পলিতে ভরপুর দুই পাড়ে সারাবছর লেগে থাকে সষ্য শ্যামল নৈসর্গিক শ্যামলিমা।
পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজকুমার থাকেন রাজকার্যে ব্যতিব্যস্ত। তিনি শুধু রাজকুমারই নন, রাজত্বের সেনাপ্রধান ও বটে। দেওয়ান পদবীতে অভিষিক্ত।
কিন্তু যখনই অবকাশ পান, বেরিয়ে পড়েন নদী পরিভ্রমণে। বিশালাকার নৌযানে চড়ে। গঙ্গাধর নদী তাকে টানে বারবার । নদী তাকে বেগ ধরে রাখতে শেখায়। নদীর অক্লান্ত ধারা তাকে অনুপ্রাণিত করে আপন কর্মযজ্ঞে একনিষ্ঠভাবে এগিয়ে চলার, নিরলস সামনের দিকে এগিয়ে যাবার।
কিন্তু এই জায়গাটা অতিক্রম করার সময় সেই বলিষ্ঠ রাজকুমার, দৃঢ়চেতা সেনাপতি কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েন! হারিয়ে ফেলেন নিজের স্বত্বাকে। মাঝিকে বলেন যানের বেগ কমিয়ে দিতে। শুনতে থাকেন ভেসে আসা অপূর্ব সুরের ভজনের লহরী। হৃদয়ের সকল সুর উজাড় করে দেওয়া এক অজ্ঞাত পরিচয় নারী কণ্ঠের আবেগমথিত নিবেদন। প্রতিনিয়ত। সন্ধ্যাবেলায় । নিত্য এই সুর শুনেন, আর ভাবেন এ কোন অপ্সরা! কোন স্বর্গ থেকে নেমে এলো এই ধরণীর বুকে!
না, সেদিন আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না রাজকুমার। খালাসিকে বললেন নৌকা নোঙর করো। -জি আজ্ঞা বলে খালাসি নৌকা ভিড়ালেন পারে । নোঙর করলেন এক প্রকাণ্ড চাতাল গাছে। নেমে পড়লেন রাজকুমার। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন সেই সুরের সন্ধানে। হৃদয় চিত্ত বিমথিত করা নৈসর্গিক সুরবালার দিকে। একসময় পৌঁছে গেলেন নির্দিষ্ট পরিসরে। -এ কি, এ তো কোনো অপ্সরা নয়, নয় কোনো স্বর্গীয় দেবী ! এ যে এক রক্তমাংসের মানবী ! সন্ধ্যা আরতিতে ঐকান্তিক ভাবে নিমগ্ন এক নিবেদিত চিত্ত ভক্ত ! কিন্তু যে দেবালয় চত্বরে বসে সে ভজন গাইছে, সে রাজকুমারের চিরপরিচিত কোনো উপাসনালয় নয়। এখানে নেই কোনও বিগ্রহ, নেই কোনও দেবমূর্তির অবস্থান। কিন্তু আবেগমথিত নিবেদনে রয়েছে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার পরম ব্যাকুলতা। নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন রাজকুমার। ভজনের লহরের সাথে তার দুটি হাত ভক্তির মুদ্রায় কখন জোড় হয়ে উঠে গেছে নিজেই বলতে পারেন না।
একসময় ভজন শেষ হলো । উপস্থিত ভক্তরা একই ভঙ্গিমায় সমাপন করলেন স্থবগান । একে একে বেরুচ্ছেন । প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এক সুকুমার যুবক। সকলের অপরিচিত। যুবক এগিয়ে এলেন। ভক্তিভরে সম্বোধন করলেন বয়োজ্যেষ্ঠদের। উচ্ছসিত তারিফ করলেন ভজন গায়িকার। গোপন রাখলেন নিজের পরিচয়। খানিকের আলাপচারিতা। দুই বয়োজ্যেষ্ঠদের একজনের ভাইজি, অপরজনের কন্যা । কুমারী। ব্যস, এতটুকু জানার পর ফিরে এলেন নিজের নৌযানে।
-খালাসি, শীঘ্র নৌকা ছাড়ো, এখনই পৌঁছতে হবে রাজদরবারে, রাজার কাছে। আরে ছাড়ো তোমাদের রশি, থাক গাছে বাঁধা। শিগগির! জলদি করো ।
রাজপ্রাসাদে পৌঁছে জানতে পেলেন রাজা বিশ্রাম নিচ্ছেন নিজ মহলে । তর সইছে না। চলে গেলেন রাজার খাস মহলে। বর্ণনা করলেন পুরো ঘটনা প্রবাহ। মহখরাজের বুঝার কিছু বাকি রইল না। যে রাজকুমার জলে স্থলে আকাশে দাপিয়ে বেড়ায় রাজ্য বিস্তারের জন্য, কোনো বন্ধন তাকে বেঁধে রাখতে পারে না, চিলের মতো ছোবল মেরে যে হাসিল করে নেয় নিজের কাঙ্ক্ষিত রাজ্য, রাজ্যাংশ, সে আজ এক কুমারীর সুরের মূর্ছনায় যখন আটকা পড়ে গেছে, সেই কুমারী যে ই হোক, নিশ্চয়ই হবে কোনো অসাধারণ গুণের অধিকারী।
মাঝি মাল্লা দের ডেকে নৌযান তৈরি রাখতে বলে দিলেন রাজা। কাল প্রত্যুষে তাঁকে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে তারা আজ সন্ধ্যায় গিয়েছিল।
কাল যে দেবপরিসরে উপস্থিত হয়েছিল এক রাজকুমার, আজ সেই অতি সাধারণ পরিসরে এক প্রতাপশালী রাজ্যের মহাশক্তিধর রাজা ! গুরুসত্রে কেউ অজানা হয়না, সবাই আসে ভক্তি নিয়ে। ভক্ত হিসেবেই অভ্যাগতদের বরণ করতে চাইলেন দুই সত্র পরিচালক ভ্রাতৃ । কিন্তু তাঁরা জানতেন না যে এই অতিথি তাঁদের মত ও পথের ভক্ত নয় । ভিন্ন ভক্তিমার্গে বিশ্বাসী হয়েও ইনি এসেছেন এক বিশেষ ব্যক্তিত্বের প্রতি ভক্তি নিয়ে। নাতিদীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে চুড়ান্ত হয়ে গেলো কোকিলকণ্ঠি মর্তের অপ্সরার সাথে রাজকুমারের বিবাহ প্রস্তাব। কোষ্টি ঠিকুজি মিলিয়ে দেখা গেলো মাত্র দুই দিন পর বিয়ের লগ্ন!
রাজকুমারের বিয়ে হবে, বারাত নিয়ে আসবেন স্বয়ং মহারাজ। কিন্তু কন্যা পক্ষের এই যে একটি মাত্র চালাঘর, না আছে বরযাত্রী বসার জায়গা, না হোমাগ্নি জ্বালানোর সঠিক বন্দোবস্ত। রাজা এবং অভিভাবক হিসেবে ছোটভাইয়ের বিয়েটা যেমন করাতেই হয়, তেমনি আত্মসম্মান এবং রাজকীয় মর্যাদার সুরক্ষা ও ! অভিভাবক রাজন্য এবার আনত মস্তকে সহযোগিতা চাইলেন কনেপক্ষের মুরব্বিদের ! খরচাপাতি যা আবশ্যক, আমি দিচ্ছি । এখানে থাকবে আমার খাস খানসামা। দুদিনের মধ্যে নির্মাণ হওয়া চাই 'অক্ষয়-বন্তী' আলয়। যেখানে অনন্তকাল ধরে জ্বলতে থাকবে আলোর জ্যোতি। যুগযুগ ধরে পর্যটকরা এখানে এলেই দেখতে পাবে এক রাজকুমারের শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল এই হোমাগ্নিকে সাক্ষ্য রেখে।
গুরুজনা তো গুরুজনই ! যথাসময়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন। শুধু আলয় নয়, আলয়ের বাইরের বেড়ায় কাঠের মধ্যে খোদাই করা হলো ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিদর্শনাবলী। শুভ লগ্নে সুসম্পন্ন হয়ে গেলো শুভ বিবাহ! যে পরিণয় সম্মন্ধ পরিণামে নিয়ে এসেছিল উভয় পরিবারের মধ্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন !
বিয়েটা যখন সুসম্পন্ন হয়েই গেলো, এবার আপনাদের পাত্রপাত্রী পরিচয় করিয়ে দেওয়া আবশ্যক । পাত্র রাজকুমার চিলারায়, উরফে শুক্লধ্বজ । কোচ রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা নরণারায়নের অনুজ। আর পাত্রী আসামের সর্বজন শ্রদ্ধেয় গুরুজনা শ্রীমন্ত শংকরদেবের ভ্রাতৃ রামরায় আতা-র দুহিতা আই ভূবনেশ্বরী । শ্রীমন্ত শংকরদেব নিজ তত্ত্বাবধানে ষোড়শ শতাব্দীতে রাতারাতি গড়ে তুলেছিলেন এই 'অক্ষয়-বন্তী' আলয়- যার দ্বীপগুলো আজও জ্বলছে, জ্বলেই চলেছে। পেতলের দরজাটা বন্ধ থাকে। খোলা হয় পূজার্চনার নির্ধারিত সময়ে। তবে গ্রিলের মধ্য দিয়ে দেখা যায় ভেতরের সেই জ্বলন্ত বাতিগুলো । স্থান ? রামরায় আতা কুঠি সত্র, আগমনী সার্কেলের অন্তর্গত সত্রসালে। জেলা- ধুবুড়ি।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুযোগ হয়েছিল এই সত্র ঘুরে দেখার। এই সত্রের যিনি সত্রাধিকার, তিনি আবার সারা আসাম সত্র সংস্থার সভাপতি। ভীষন ব্যস্ত মানুষ। সেদিন তাঁর সাথে দেখা হয়নি- বাইরে ছিলেন বলে। কিন্তু সাক্ষাৎ হয়েছিল দুজন 'ভকত'- এর সঙ্গে। ভকতরা হলেন সত্র চৌহদ্দিতে বসবাস করা অবিবাহিত ভক্ত । তাদের সাথে জমিয়ে আলাপ হলো দীর্ঘক্ষণ। এরমধ্যে আসরের নামাজের সময়। নামাজ পড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করতেই এক ভকত নিজ হাতে কুয়া থেকে পানি তুলে দিলেন। যে নাম ঘরের মধ্যে গুরুজনা সাধনা করেছেন কয়েক বছর ধরে, সেই নামঘরের প্রাঙ্গণে দিলেন নামাজের জায়গা ঠিক করে। নামাজ শেষে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন সত্র পরিসর। দেখালেন যৌতুক হিসেবে আই ভূভনেশ্বরীকে রাজা নরণারায়নের দেওয়া সেই পিতলের রথখানা- যা কেবল রথযাত্রার দিন বার করা হয়ে থাকে। বিদায় জানাতে ফটক পর্যন্ত এগিয়ে এলেন দুই ভকত। জানালেন সকল সত্রের ফটকের নাম হয় চাঁদ সাঁই- এর নামে । -কে এই চাঁদ সাঁই ?
-উনি ছিলেন গুরুজানার এক মুসলিম ভক্ত। পেশায় ছিলেন দর্জি । সাক্ষাৎ হয়েছিল কোচবিহারে। কুড়ি বছর ধরে সঙ্গী ছিলেন গুরুজনার । একসময় অভিযোগ করলেন- গুরুদেব, সবাই আপনার শিষ্যদের কথা স্মরণ করবে, কিন্তু মুসলিম বলে আপনার শিষ্যরূপে কেউতো আমাকে ইয়াদ করবে না। শিষ্যের এই আবদার শুনে গুরুজনা প্রীত হয়ে বললেন, এমন ব্যবস্থা করে যাবো, যে কেউ আমার সত্রসমুহে প্রবেশ করবে, 'চাঁদ সাঁই প্রবেশদ্বার' দিয়েই প্রবেশ করতে হবে ।
বেরিয়ে এলাম একবুক পরিতৃপ্তি নিয়ে। তাকিয়ে দেখলাম সেই চাতাল বৃক্ষের গোড়ার দিকে। গঙ্গাধর নদী এখন চলে গেছে বহুদূর। পরিত্যক্ত সেই লোহার নোঙরটা নাকি আজও পড়ে আছে পঁচে যাওয়া চাতাল বৃক্ষের গোড়ায়।
Comments
Post a Comment